ফ্যাক্ট চেকস
‘মুজিব বাহিনী’ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় সংঘবদ্ধ ‘প্রপাগান্ডা ক্যাম্পেইন’!
বিভ্রান্তিকর

‘মুজিব বাহিনী’ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় সংঘবদ্ধ ‘প্রপাগান্ডা ক্যাম্পেইন’!

সম্প্রতি মুজিব বাহিনী নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে BongoGraph, Faporbaz সহ একাধিক পেইজ থেকে সংঘবদ্ধভাবে একই ধরনের ফটোকার্ড শেয়ার করা হচ্ছে। এতে ‘মুজিব বাহিনী’র সদস্যরা কেন মুক্তিযোদ্ধা নয় সেরকম কারণ দেখিয়ে ৫ টি পয়েন্ট উল্লেখ করা হয়েছে।

দেখুন এখানে, এখানে

ফ্যাক্ট-চেক জোনের বিশ্লেষণে উক্ত পোস্টগুলোতে একাধিক ‘অপতথ্য’ এবং ‘ইতিহাস বিকৃতি’  দেখা গেছে।

 

মুজিব বাহিনীর সদস্যরা মুক্তিযোদ্ধা নন? কি বলছ নতুন আইন

ফটোকার্ড ৫ টি পয়েন্ট তুলে ধরার আগে শুরুতেই দাবি করা হয় মুজিব বাহিনীর সদস্যরা নতুন আইনে মুক্তিযোদ্ধা নন।   ‘মুজিব বাহিনী’ র নাম নতুন সংজ্ঞা থেকে বাদ পড়ার তথ্যটি সঠিক হলেও,  মুজিববাহিনীর সদস্যরা আর ‘মুক্তিযো/দ্ধা’ হিসেবে গণ্য না হওয়ার তথ্যটি বিভ্রান্তিকর৷ নতুন সংজ্ঞা অনুসারে, যারা ভারতে বিভিন্ন ট্রেনিং ক্যাম্পে নিজেদের নাম লিপিবদ্ধ করেছেন, তারা মুক্তিযো/দ্ধা হিসেবেই গণ্য হবেন৷ যেহেতু মুজিব বাহিনীর সদস্যরাও ভারতে ট্রেনিং নিয়েছে, তারাও মুক্তিযো/দ্ধা’র সংজ্ঞায় পড়েন৷ একইভাবে কাদেরিয়া বাহিনী,  হেমায়েত বাহিনী এদের নামও আলাদা করে সংজ্ঞায় নেই৷ কিন্তু তারাও মুক্তিযো/দ্ধা। বিস্তারিত 

ছাত্রলীগ দ্বারা গঠিত মুজিব বাহিনীর ট্রেনিং ‘র’ এর অধীনে?

ছাত্রলীগের বেশিরভাগই ছিল FF তথা মুক্তিবাহিনীতে৷ তবে ছাত্রলীগের একটি অংশ, যারা আদর্শিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা নিয়ে ৬০ এর দশক থেকে কাজ করছিলো, নিউক্লিয়াস গঠন করেছিল, যারা দীর্ঘদিন ধরে নানা পাঠচক্র দ্বারা তাত্বিক জ্ঞানের চর্চা করেছে, তারা মুজিব বাহিনীর মূল নেতা। এরা প্রত্যেকেই তরুণ, শিক্ষিত।

১৯৭১ সালে ভারতে বাংলাদেশের বিভিন্ন বাহিনী যে প্রশিক্ষণ নিয়েছে, তার অনেকাংশই ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’(RAW)-এর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়েছিল।এটি শুধু মুজিব বাহিনীর ক্ষেত্রে নয়, বরং মুক্তিবাহিনীসহ অন্যান্য গেরিলা ইউনিটের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য ছিল।তাই বিষয়টিকে শুধুমাত্র মুজিব বাহিনীর বিরুদ্ধে আলাদা অভিযোগ হিসেবে উপস্থাপন করা বিভ্রান্তিকর।

সূত্র:  মুজিব বাহিনীর সত্যি মিথ্যা (মহিউদ্দিন আহমেদ)

 

মুক্তিযুদ্ধ নয়, মুজিববাহিনীর আদর্শ ‘মুজিবের আদর্শ’ প্রতিষ্ঠা?

মুজিব বাহিনী ‘মুক্তিযুদ্ধ করেনি’ জাতীয় যে দাবি ফটোকার্ড গুলোতে করা হয়েছে, এটি ‘ইতিহাস বিকৃতি’ এবং ‘প্রপাগান্ডা’। মুজিব বাহিনী অবশ্যই সম্মুখ সমরে যুদ্ধ করেছে৷ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা স্থানীয় মুক্তিবাহিনীর সাথে সমন্বয় করে  যুদ্ধ করেছে৷ সেক্টরগুলোর অধীনেও যুদ্ধ করেছে৷ আবার কিছু কিছু জায়গায় তারা নিজেরাই অপারেশন চালিয়েছে৷ এ বাহিনীর বহু সদস্য সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন—যা তাদের সরাসরি যুদ্ধ অংশগ্রহণের প্রমাণ।

ছবি- মুজিব বাহিনীর শহীদের কবর ( বাম থেকে শহীদ মোজাম্মেল হক আবু , শহীদ সাইফুল ইসলাম এবং শহীদ আবু জাহিদ)

 

সিলেটের সুলেমান আহমদ, রংপুরের মুখতার এলাহী, যশোরের আব্দুল হামিদ, সিরাজগঞ্জের সুলতান মাহমুদ ও আব্দুস ছামাদ,  ঢাকার যাত্রাবাড়ি-গেন্ডারিয়া কিবরিয়া, নাটোরের মুজিবর, নওগাঁর মামুন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোলাম নবী বিশ্বাস, নোয়াখালীর মাইজদীর ওয়াহিদুর রহমান, চট্টগ্রামের স্বপন কুমার চৌধুরী, রাজশাহীর কাজী নুরুন্নবী, ঢাকা কলেজের নজরুল, জগন্নাথ কলেজের নজরুল, পাবনার আব্দুর রাজ্জাক রিদ্দিক ও সাধন, মন্টু। এরকম নাম কয়েকশত থেকে  হাজার রয়েছে। এঁরা প্রত্যেকে শহীদ হয়েছেন পাকিস্তান আর্মির সাথে সম্মুখ যুদ্ধে অথবা রাজাকারদের হাতে। এঁরা প্রত্যেকে বিএলএফ/ মুজিব বাহিনীর গেরিলা। চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, পাবনা, সিলেট অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা বিএলএফ/ মুজিব বাহিনীর সদস্য।

সুত্র- মুজিব বাহিনীর সত্য মিথ্যা (হাসান মোরশেদ) লিংক

অবশ্যই মুজিববাহিনীর উদ্দেশ্য ছিল মুজিবের আদর্শ প্রতিষ্ঠা করা৷ কেবল মুজিব বাহিনী কেন, এই বাংলার প্রতিটি মুক্তিকামী মানুষ ৭১ এ প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে ‘মুজিবের আদর্শ’ প্রতিষ্ঠা করার জন্য ঝাপিয়ে পড়েছিল৷ ‘মুজিবের আদর্শ’  ভাল লেগেছিল বলেই তো ৭০ এর নির্বাচনে ২৮৮ আসনেই জনতার রায় মুজিবের পক্ষে পড়েছিল। মুজিবের আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে বলেই তো “তোমার নেতা, আমার নেতা, শেখ মুজিব, শেখ মুজিব” স্লোগানে প্রতিটি ক্যাম্প, প্রতিটি রণাঙ্গন প্রকম্পিত হয়েছে।

 

মুজিব বাহিনীর গুম, খুন, লুটপাট?

মুজিব বাহিনী বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরার পর পরই অস্ত্র সারেন্ডার করে । স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে মুজিব বাহিনীর সদস্যরা গুম করেছে, এমন কোন নির্ভরযোগ্য প্রমান আজ অব্দি কেউ উপস্থাপন করতে পারেনি। স্বাধীনতার পরপরই অনেক ক্ষেত্রে রাজাকারদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক হামলা বা সম্পদ দখলের ঘটনা ঘটেছিল—যা বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধাদের অংশগ্রহণে সাধারণ জনগণ, মুক্তিবাহিনী, মুজিব বাহিনী, কাদেরিয়া বাহিনী সহ নানা বাহিনীর সদস্যরাই এই রাজাকার নিধনে অংশ নিয়েছে। এগুলোকে আলাদাভাবে মুজিব বাহিনীর ওপর চাপানো তথ্যভিত্তিক নয়।

 

মুজিব বাহিনীর সদস্যরা স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা এবং বামদের হত্যা করেছে?

‘মুজিব বাহিনীর সদস্যরা স্থানীয়  মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করেছে ‘–এ দাবির পক্ষে কোনো নির্দিষ্ট নাম, তালিকা বা নির্ভরযোগ্য সূত্র পাওয়া যায় না।সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত এসব তথ্যের সঙ্গে কোনো গবেষণা বা ঐতিহাসিক দলিলের মিল নেই। সোশ্যাল মিডিয়ায় যে সব পেইজ এই ধরনের প্রচারণা চালাচ্ছে, তারাও এর স্বপক্ষে নূন্যতম কোন রেফারেন্স উল্লেখ করেনি।

এসব পেজের পক্ষ থেকে, ‘মুজিব বাহিনী দ্বারা বাম নিধন’ এর আরেকটি দাবি তোলা হয়েছে। এই দাবিও বিভ্রান্তিকর। এক্ষেত্রে আপনাকে বামপন্থীদের ভুমিকাও জানতে হবে।

মুক্তিযুদ্ধে বামপন্থীদের ভুমিকা নিয়ে বদরুদ্দীন ওমর বলেন, “তাঁরা আওয়ামী লীগ ও ইয়াহিয়া খানকে একই পাল্লায় মাপলেন। এটি কখনো হয় নাকি? যেখানে দেশের মানুষ লড়াই করছে, পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করছে, সেখানে তাঁরা বলে দিলেন ‘দুই কুকুরের লড়াই।’ এর চেয়ে সর্বনাশা কিছু হতে পারে না। তাঁদের উচিত ছিল আওয়ামী লীগের সঙ্গে একত্রে মুক্তিযুদ্ধ করা। এপ্রিলের শুরুতে একটি বৈঠক হয়েছিল, যাতে সুখেন্দু দস্তিদার, আবদুল হক, মোহাম্মদ তোয়াহার সঙ্গে আমিও ছিলাম। সেখানে মাওলানা ভাসানীর একটি চিঠিও দেখানো হলো। ঠিক হলো কমিউনিস্টরাও একসঙ্গে লড়াই করবে। কিন্তু এপ্রিলের ১৩ বা ১৪ তারিখে আমি যশোরে ছিলাম। চৌ এনলাইয়ের বিবৃতি দেখানো হলো, যেখানে তিনি পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার কথা বলেছেন। আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম। আমাদের সঙ্গে সৈয়দ জাফর নামের এক কর্মী ছিলেন, তাড়াতাড়ি তাঁকে নিয়ে ঢাকায় চলে আসি।”

“এরপর তাঁরা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ও শ্রেণিশত্রু খতমের লাইন নিলেন। যেখানে জাতীয় সংগ্রাম চলছে, সেখানে তাঁরা শ্রেণিশত্রু খতম করতে গেলেন। আপনি যখন একটি মানুষকে হত্যা করবেন, তখন তাঁর আত্মীয়স্বজন, পরিবার, প্রতিবেশী— সবাই বিরুদ্ধে চলে যাবে। সেটাই হয়েছে। ফলে জনগণ তাঁদের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করল এবং ’৭১-এর আগস্টে পালিয়ে আসতে বাধ্য হলেন। নিজের বোকামি ও মূর্খতার কারণেই তাঁদের এই অবস্থা হয়েছে।”

‘বামপন্থীরা পালাতে বাধ্য হল’-বদরুদ্দীন উমর 

‘কমিউনিস্টরা বাংলাদেশকে জানতেন না’-বদরুদ্দীন উমর

যেসব ‘স্বাধীনতা বিরোধী’ বাম ৭১ এ শ্রেণিশত্রু ‘খতমের’ নামে মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করেছিল, সম্মুখ যুদ্ধে যদি মুজিববাহিনী তাদেরকে হত্যা করে থাকে, তাহলে সেটাতে অস্বাভাবিকত্ব টা কোথায়?

তাছাড়া, মুজিব বাহিনীর সদস্যদের বেশিরভাগই নিজেরাই সমাজতন্ত্র তথা বাম ঘরানায় বিশ্বাসী ছিল। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে মুজিবাহিনীর দ্বারা বাম নিধন সম্ভবই নয়৷ কারণ,  মুজিব বাহিনীরই বড় অংশ সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য নিজেরাই  ‘জাসদ’ নামক বাম দল খোলে।

রক্ষীবাহিনী মুজিব বাহিনী দ্বারা গঠিত?

রক্ষীবাহিনী শুরুর দিকে শতভাগ মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে গঠিত হয়৷ সেখানে মুক্তিবাহিনী, কাদেরিয়া বাহিনী,  মুজিব বাহিনী সব ধরনের মুক্তিযোদ্ধারাই ছিলেন৷ শুরুতে সেখানে একজনও অমুক্তিযোদ্ধা ছিল না। তাই কেবল মুজিব বাহিনী দ্বারা রক্ষীবাহিনী গঠিত হয়েছিল, এটা ভুল তথ্য৷ মুজিব বাহিনীর কিছু ছেলে রক্ষী বাহিনীতে ঢুকেছিল, বাকিরা যার যার পড়াশোনায়, শিক্ষাঙ্গনে  ফেরত যায়। উল্লেখ্য  এই রক্ষীবাহিনীর সবাই ই পরবর্তীতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়।

সূত্র- রক্ষীবাহিনীর সত্য মিথ্যা (আনোয়ার উল ইসলাম) পৃষ্ঠা- ৩৫

 

ফ্যাক্ট-চেক জোন সিদ্ধান্ত- ভাইরাল ফটোকার্ডগুলোতে মুজিব বাহিনী সম্পর্কে যে তথ্যগুলো তুলে ধরা হয়েছে, তার বড় অংশই আংশিক সত্যকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন অথবা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন দাবি। ঐতিহাসিক প্রমাণ অনুযায়ী, মুজিব বাহিনী মুক্তিযুদ্ধের একটি সক্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল এবং তাদের সদস্যরাও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বিবেচিত হন।