ফ্যাক্ট চেকস
‘মুক্তিযোদ্ধা’র সংজ্ঞা’ নিয়ে সংসদে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিলেন স্পীকার এবং নাহিদ ইসলাম
বিভ্রান্তিকর

‘মুক্তিযোদ্ধা’র সংজ্ঞা’ নিয়ে সংসদে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিলেন স্পীকার এবং নাহিদ ইসলাম

২৯ এপ্রিল সংসদে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন,” মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা সংসদ অনুমোদন করেছে। বর্তমানে যারা সরাসরি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন, তারাই মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বিবেচিত হন; অন্যরা মুক্তিযুদ্ধের সহায়ক হিসেবে গণ্য।”
দেখুন  নিউজ,  ভিডিও,

 

অন্যদিকে ৩০ এপ্রিল এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলাম আরেক এমপি মুজিব বাহিনীর সদস্য ফজলুর রহমানকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ কাউন্সিল আইন সংশোধনে মুজিব বাহিনীকে মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। বর্তমান আইন অনুসারে মুজিব বাহিনীর কেউ মুক্তিযোদ্ধা না। কিন্তু সংসদে মুজিব বাহিনীর কিছু লোক আছে যারা নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বারবার জাহির করছে।”

দেখুন এখানে , ভিডিও

ফ্যাক্ট-চেক জোন এর অনুসন্ধানে দেখা গেছে মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা নিয়ে স্পিকার হাফিজ এবং এনসিপি নেতা নাহিদ দুজনই ভুল তথ্য দিয়েছেন।

“মুজিব বাহিনীর সদস্যরা মুক্তিযোদ্ধা নন?” –যা বলছে নতুন আইন

সর্বশেষ জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন, ২০২২ এর সংজ্ঞায় ‘মুজিববাহিনী’র নাম আলাদা করে উল্লেখ করা হলেও, ২০২৫ সালের সংশোধনীতে ‘মুজিববাহিনী’র নাম বাদ দেয়া হয়েছে৷ মূলত এর উপর ভিত্তি করেই নাহিদ ইসলাম দাবি করেছেন ‘মুজিব বাহিনী মুক্তিযোদ্ধা নয়”।

তবে নতুন সংজ্ঞা অনুসারে, মুজিব বাহিনী আলাদা বাহিনী হিসেবে স্বীকৃতি না পেলেও, মুজিব বাহিনীর সদস্যরা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন ৷

সংসদে পাশ হওয়া নতুন সংশোধনী অনুসারে –“ যে সকল ব্যক্তি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে বাংলাদেশের সীমানা অতিক্রম করিয়া ভারতের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে তাঁহাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করিয়াছিলেন এবং বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হইয়া হানাদার ও দখলদার পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী এবং তাহাদের এই দেশীয় সহযোগী রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস্, তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম এবং দালাল ও শান্তি কমিটির বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করিয়াছেন”, তারা ‘মুক্তিযোদ্ধা’ বলে বিবেচিত হবেন ৷

এখানে উল্লেখ্য যে, মুজিব বাহিনীর সদস্যরা মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের ক্যাম্পে ট্রেনিং নিয়েছেন, যা নতুন আইনের সংজ্ঞার শর্তকে পূরণ করে। এর স্বপক্ষে বিভিন্ন প্রামাণ্য দলিল যেমন: লাল মুক্তিবার্তা, ভারতীয় তালিকা ইত্যাদি তালিকায় মুজিববাহিনীর অনেকেরই নাম লিপিবদ্ধ হয়েছে৷ জামুকা’র আইন অনুসারে এসব তালিকায় যাদের নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যথাযথ প্রমাণ উপস্থাপন করলেই, সরকারিভাবে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় জায়গা পাবেন। এটি সব বাহিনীর সদস্যদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

এছাড়াও নাহিদ ইসলাম মুজিব বাহিনীর সদস্যরা ‘মুক্তিযুদ্ধ’ করেন নি বলে যে মন্তব্য করেছেন সেটিও ‘বিতর্কিত’।মুজিব বাহিনীর সদস্যরা যুদ্ধকালীন সময়ে দেশে প্রবেশ করে সক্রিয়ভাবে বিভিন্ন অপারেশনে অংশ নেয়ার ঘটনা ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত।

পড়ুন মহিউদ্দিন আহমেদ এর লেখা: মুজিব বাহিনীর সত্য মিথ্যা

লেখক হাসান মোরশেদ এর লেখা 

বীর মুক্তিযোদ্ধা লিনু হকের লেখায় মুজিব বাহিনীর বেশ কয়েকজন শহীদের তালিকা

প্রসঙ্গত নাহিদ ইসলাম বিএনপির এমপি এবং মুজিব বাহিনীর সদস্য ফজলুর রহমানকে উদ্দেশ্য করে এই উক্তি দিয়েছিলেন৷ ফ্যাক্ট-চেক জোন নিশ্চিত করেছে ফজলুর রহমানের নাম ‘লাল মুক্তিবার্তা’য় রয়েছে। এই তালিকায় থাকা সকলেই ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে গণ্য হবেন৷

 

যারা সরাসরি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন, তারাই কেবল মুক্তিযোদ্ধা?

স্পিকার হাফিজের এই দাবিটিও বিভ্রান্তিকর। অস্ত্র হাতে নেয়া ছাড়াও আইন অনুসারে যারা মুক্তিযোদ্ধা বলে গণ্য হবেন, তাদের নিয়ে নতুন আইন বলছে,” বাংলাদেশের নিম্নবর্ণিত নাগরিকগণও বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হইবেন, যথা:-

(ক) হানাদার ও দখলদার পাকিস্তানি বাহিনী ও তাহাদের সহযোগী কর্তৃক নির্যাতিত সকল নারী (বীরাঙ্গনা); এবং

(খ) মুক্তিযুদ্ধকালে আহত বীর মুক্তিযোদ্ধাগণের চিকিৎসাসেবা প্রদানকারী ফিল্ড হাসপাতালের সকল ডাক্তার, নার্স ও চিকিৎসা-সহকারী;”

অর্থাৎ, বীরাঙ্গনা,মুক্তিযুদ্ধকালীন ফিল্ড হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা দেয়া ডাক্তার, নার্স বা সহযোগীরাও ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ বলে গণ্য হবেন। এছাড়াও সংজ্ঞা অনুসারে “প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার (মুজিবনগর সরকার)” এর সদস্যরাও বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বিবেচিত হবেন।

দেখুন জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫

 

ফ্যাক্ট-চেক জোন সিদ্ধান্ত: ‘মুজিব বাহিনীর কেউ মুক্তিযোদ্ধা না’ বলে নাহিদ ইসলামের দাবিটি সত্য নয়৷ একই সাথে মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা নিয়ে সংসদে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ।

 

আরো দেখুন

অস্তিত্বহীন টিপাইমুখ বাঁধ নিয় সংসদ স্পীকারের ভুল তথ্য উপস্থাপন