ফ্যাক্ট চেকস
বঙ্গবন্ধু কি শপথ না নিয়েই ক্ষমতা নিয়েছিলেন?
আলোচিত ফ্যাক্টচেক

বঙ্গবন্ধু কি শপথ না নিয়েই ক্ষমতা নিয়েছিলেন?

সম্প্রতি একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের টক শো তে ব্যারিস্টার ফুয়াদ দাবি করেছেন “শেখ মুজিব দেশে ফিরে শপথটা পর্যন্ত নেন নাই৷  সিংহাসনে গিয়ে বসে পড়লো” দেখুন এখানে 

এর আগে একই ধরনের দাবি করেছিলেন ব্যারিস্টার শাহরিয়ার। দেখুন এখানে

বঙ্গবন্ধুর শপথ নিয়ে এই প্রচারণাটি নতুন নয়। বিশেষ করে জামাতপন্থীদের মতে, তিনি ১৯৭২ সালে কোনো শপথ ছাড়াই হঠাৎ ক্ষমতা দখল করেছিলেন। কিন্তু ইতিহাসের টাইমলাইন দেখলেই বোঝা যায়, এটি অর্ধসত্যের ওপর দাঁড়ানো একটি রাজনৈতিক প্রপাগান্ডা।

ফ্যাক্টচেক

বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরার পর দুইবার শপথ নেন।

১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে বাংলাদেশের প্রথম সরকার শপথ নেয়। সেই সরকারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করা হয়। তবে সেসময় তিনি পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী থাকায় সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। তাজউদ্দীন আহমদ হন প্রধানমন্ত্রী। এসময় শপথ বাক্য পাঠ করান অধ্যাপক ইউসুফ আলী।

শেখ মুজিব ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ দেশে ফেরেন। এরপর ১১ জানুয়ারি তিনি রাস্ট্রপতির ক্ষমতাবলে সাময়িক সংবিধান আদেশ-১৯৭২ (Provisional Constitutional Order, 1972) জারি করেন, যার মাধ্যমে বাংলাদেশে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা চালু হয়। প্রশ্ন হচ্ছে ‘সাময়িক সাংবিধানিক আদেশ’ জারি করার আগে তিনি কি রাস্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন?

বঙ্গবন্ধু রাস্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেয়ার তথ্য ঐতিহাসিক নথি দ্বারা প্রমাণিত।

দেশে ফেরার পর ১০ জানুয়ারিতেই বঙ্গবন্ধু রাস্ট্রপতি হিসেবে লিখিত শপথ নেন, যেই শপথনামায় বঙ্গবন্ধুর সাক্ষরের পাশাপাশি মুজিবনগর সরকারের শপথ বাক্য পাঠদানকারী অধ্যাপক ইউসুফ আলীও সাক্ষর করেন।

১০ জানুয়ারি, ১৯৭২ তারিখে বঙ্গবন্ধুর লিখিত শপথনামা

সেই শপথনামায় সাক্ষর করার পরদিন ১১জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু রাস্ট্রপতি হিসেবে ‘সাময়িক সাংবিধানিক আদেশ’  (Provisional Constitutional Order, 1972) জারি করে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা চালু করেন।

১২ জানুয়ারি ১৯৭২  রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান  আবু সাদাত মোঃ সায়েমকে প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগ করেন। এ সময় প্রধান বিচারপতিকে বঙ্গবন্ধু শপথ বাক্য পাঠ করান।এর পরপরই বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতির পদ হতে পদত্যাগ করেন।

বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতির পদ হতে পদত্যাগ ঘোষণা করার পর, সাময়িক সংবিধান আদেশের ৮নং ধারা বলে মন্ত্রিপরিষদের সিদ্ধান্তক্রমে বিচারপতি আবু সাইদ চৌধুরীকে ২য় রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগদান করা হয়। অতঃপর প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোঃ সায়েম নতুন রাষ্ট্রপতি আবু সাইদ চৌধুরীকে শপথ বাক্য পাঠ করান।

পরবর্তীতে রাস্ট্রপতি আবু সাইদ চৌধুরীর হাতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বঙ্গবন্ধু শপথ গ্রহন করেন। এর আগে মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ সহ বাকিরা মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করেন এবং নতুন করে শপথ গ্রহন করেন।

সূত্র-

১)সুত্র-জাসদের উত্থান পতন, পৃষ্ঠা-৬৫ (মহিউদ্দিন আহমেদ)

২)শেখ মুজিবের শাসনকাল (ব্যারিস্টার মওদুদ)

৩) বঙ্গবন্ধুর প্রধানমন্ত্রীর বৈধতা (ড. কামাল হোসেন) লিংক

৪) স্বাধীনতার ঘোষণা এবং পরবর্তী ঘটনাপঞ্জি (এইচ টি ইমাম) লিংক

১৩ জানুয়ারি, ১৯৭২ এর দৈনিক পূর্বদেশ সংখ্যায় বঙ্গবন্ধুর শপথ

বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে মামলা, আদালত কর্তৃক বৈধ ঘোষণা

রাস্ট্রপতি হিসেবে ‘সাময়িক সাংবিধানিক আদেশ’  (Provisional Constitutional Order, 1972) জারি করার বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে আবেদন করেছিলেন যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত ফজলুল হক। তাদের যুক্তি ছিল, ‘সাময়িক সংবিধান আদেশ ১৯৭২’-টি স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে উল্লিখিত মূল কাঠামোকে লঙ্ঘন করেছে। ১৯৭২ সালের ‘সাময়িক সংবিধান আদেশ’ অনুযায়ী, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে রাষ্ট্রপতি হিসেবে মনোনীত শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার কাঠামোতে এরূপ পরিবর্তন (সংসদীয় ব্যবস্থা প্রবর্তন) আনার কোনো প্রকার এখতিয়ার ছিল না।”

আদালত আবেদনটি খারিজ করে রায় দেন যে, “স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে রাষ্ট্রপতিকে শুধু নির্বাহী ক্ষমতাই নয় বরং আইন প্রণয়নের ক্ষমতাও প্রদান করা হয়েছিল। আইন প্রণয়নের এই ক্ষমতাটি এক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ, উক্ত ক্ষমতাই রাষ্ট্রপতিকে একটি অস্থায়ী সংবিধান গঠন করার সুযোগ দেয়, এবং এর পরিপ্রেক্ষিতেই তিনি ‘অস্থায়ী সংবিধান আদেশ, ১৯৭২’ জারি করেন। আদালত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে এরূপ কোন ধারা খুঁজে পান নি, যা রাষ্ট্রপতি কর্তৃক সরকার কাঠামোর পরিবর্তন আনার ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করে। ফলস্বরূপ, আদালত বলেন যে, ১৯৭২ সালের আদেশের ৫ থেকে ৮ ধারায় নির্ধারিত রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় ব্যবস্থায় ক্ষমতার পরিবর্তন বৈধ এবং আদেশের ৮ ধারায় নতুন রাষ্ট্রপতির নিয়োগ আইনসিদ্ধ।” দেখুন- এ.কে.এম. ফজলুল হক এবং অন্যান্য বনাম রাষ্ট্র

 

সামগ্রিক বিশ্লেষণ, ঐতিহাসিক রেফারেন্স, আদালতের রায় বিবেচনায় বঙ্গবন্ধুর শপথ গ্রহণের ঘটনাপ্রবাহ সংক্ষেপে-

১০ জানুয়ারি, ১৯৭২- বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন এবং অধ্যাপক ইউসুফ আলীর পরিচালনায় লিখিত শপথ গ্রহণ

১১ জানুয়ারি, ১৯৭২ – রাস্ট্রপতি হিসেবে ‘সাময়িক সাংবিধানিক আদেশ’ (Provisional Constitutional Order, 1972) জারি

১২ জানুয়ারি, ১৯৭২ – রাস্ট্রপতি শেখ মুজিব দ্বারা বিচারপতি আবু সাদাত মোঃ সায়েমকে নিয়োগদান

১২ জানুয়ারি ১৯৭২ – রাস্ট্রপতি শেখ মুজিবের পদত্যাগ এবং ২য় রাস্ট্রপতি হিসেবে আবু সাঈদ চৌধুরীর শপথগ্রহণ

১২ জানুয়ারি ১৯৭২ – রাস্ট্রপতি আবু সাইদ চৌধুরীর হাতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ মুজিবের শপথ গ্রহণ

১৯৭৪ – হাইকোর্ট এবং আপিল বিভাগ কর্তৃক রাস্ট্রপতি হিসেবে জারিকৃত ‘সাময়িক সাংবিধানিক আদেশ’ (Provisional Constitutional Order, 1972) কে বৈধ ঘোষণা

 

ফ্যাক্ট-চেক জোন সিদ্ধান্ত: “শেখ মুজিব শপথ না নিয়েই ক্ষমতা নিয়েছিলেন”,- ব্যারিস্টার ফুয়াদ এবং ব্যারিস্টার শাহরিয়ারের এসব দাবি মিথ্যা এবং বিভ্রান্তিকর।