ফ্যাক্ট চেকস
হাম নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এত ‘মুডসুইং’! একের পর এক বিভ্রান্তিকর তথ্য
বিভ্রান্তিকর

হাম নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এত ‘মুডসুইং’! একের পর এক বিভ্রান্তিকর তথ্য

সাম্প্রতিক ‘হাম মহামারী’ নিয়ে দেশ যখন বিপর্যস্ত তখন একেক সময়ে একেক তথ্য দিয়ে ক্রমাগত বিভ্রান্ত ছড়িয়ে যাচ্ছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। শুধু স্বাস্থ্যমন্ত্রীই নন, এসব বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণায় যোগ দিয়েছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী এবং তার স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারীও।

আওয়ামী লীগ আমলে টিকা দেয়া হয়েছে নাকি হয়নি?

২৯ মার্চ,২০২৬ হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘মিজেলসের (হাম) রোগী অনেক বেড়েছে। আট বছর আগে মিজেলসের ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছিল। এরপর কোনো সরকারই ভ্যাকসিন দেয়নি। আমরা ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছি। পারচেজ কমিটি অনুমোদন দিয়েছে। দ্রুত ভ্যাকসিন সংগ্রহ করে কার্যক্রম শুরু করা হবে।’  দেখুন

 

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এই দাবি ফ্যাক্ট-চেকে অসত্য প্রমাণিত হয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের টিকাদান সম্পর্কিত কর্মসূচি ইপিআইয়ের ডাটাবেজ থেকে জানা যায়, হামের টিকাদান কর্মসূচি ২০২২, ২০২৩, ২০২৪, ২০২৫ সালে স্বাভাবিক গতিতেই চলমান ছিল। ডাটাবেজের তথ্য অনুযায়ী ২০২১ সালে এম আর-১ এবং এম আর-২ টিকা কভারেজের হার ছিল যথাক্রমে ৯৭ দশমিক ৩ ও ৯৪ দশমিক ৮ শতাংশে। ২০২২ সালে এমআর-১ শতভাগ এবং এমআর-২ ৯৭ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছে। ২০২৩ ও ২৪ সালেও এই হার ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশের মধ্যে ছিল। বিস্তারিত

 

১ দিন পরেই ৩০ মার্চ কথার সুর বদল করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, “হাম টিকাদান ক্যাম্পেইন গত ৮ বছর হয়নি”। দেখুন

১৩ মে হামের টিকাদান বিষয়ক স্বাস্থ্য অধিদফতরের আয়োজিত ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক সহকারী জিয়াউদ্দিন হায়দারও বলেন, “আওয়ামী লীগ সরকার ডেটা টেম্পারিংয়ে ওস্তাদ ছিল। ২০২০ সালে হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইনের তথ্য সত্য নয়।” দেখুন

স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক সহকারী এই দাবিও ফ্যাক্ট-চেকে অসত্য প্রমাণিত হয়। ২০২০ এর ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত হামের টিকাদান কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। ইউনিসেফের প্রতিবেদনে জানানো হয় দেশজুড়ে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লক্ষ শিশুকে হাম ও রুবেলার টিকা দেওয়া হয়েছিল। বিস্তারিত

 

এতবার ফ্যাক্ট-চেকিং এর পরেও ১৭ মে স্বাস্থ্যমন্ত্রী আবারো বলেন, “২০২০ সালে ডিসেম্বরে সর্বশেষ হয়েছে, তারপরে ২৬ পর্যন্ত আমরা শুরু করার আগপর্যন্ত মিজেলসের কোনো টিকা দেওয়া হয় নাই।”দেখুন

এসবের মধ্যেই ১৮ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী দাবি করেছেন বিগত দুটি সরকার হামের টিকা দেয়নি৷ তারেক রহমান বলেন, “সারাদেশে শিশুদেরকে হামের টিকা না দেওয়ার ফলে বিগত ইমিডিয়েট দুটি সরকারের জীবনবিনাশী ব্যর্থতা মনে হয় ক্ষমাহীন অপরাধ।” দেখুন এখানে

 

টিকা আছে, টিকা নাই!

২২ এপ্রিল স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, “৬ মাসের স্টকে আছে হামের টিকা। পরবর্তী ৬ মাসে টিকা দিতে সমস্যা হবে না বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, টিকার কোনো সংকট নেই।” দেখুন

এর প্রায় ১ মাস পর ১৭মে তিনি পুরোপুরি উলটো সুরে জানান, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় হামের টিকার কোনো মজুত ছিল না। তিনি বলেন, ” মিজেলসের একটা টিকা আমাদের হাতে ছিল না।” দেখুন

২৫ মে তিনি আবার জানান, ” ইউনিসেফ ৭ বার প্রস্তাব দেয়া সত্ত্বেও পয়সা খাওয়ার জন্য আ. লীগ ও অন্তর্বর্তী সরকার হামের টিকা নেয়নি’ দেখুন

কবে নিয়ন্ত্রণে আসবে?

১৭ এপ্রিল মন্ত্রী জানান, “হামের প্রকোপ কিছুটা কমেছে। আগামী ২০ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী টিকা কার্যক্রম শুরু করলে এটা আরও কমে যাবে। আশা করি আগামী ১ সপ্তাহের মধ্যে হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে।” দেখুন

প্রায় ৩ সপ্তাহ পর, ১১ মে তিনি আবার বলেন,”হাম নিয়ন্ত্রণে আসতে ৪ সপ্তাহ লাগবে। যাদের টিকা দেওয়া হয়েছে তাদের রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা তৈরি হতে চার সপ্তাহ সময় লাগবে। তারপর হামের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।” দেখুন

তবে মন্ত্রীর দাবির প্রতিফলন আজ (২৬ শে মে) অব্দি দেখা যায়নি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সূত্রমতে গত ২৪ ঘন্টায় নতুন করে মৃতের সংখায় ১০ জন, যা এই পর্যন্ত মোট মৃতের সংখ্যাকে ৫৫০ এর ঘরে নিয়ে গেছে।

এই যখন পরিস্থিত, তখন সাধারণ জনগনের চাওয়া দায়িত্বপ্রাপ্তরা যেন দায়িত্বশীল জায়গা থেকে সঠিক তথ্য দেন। একেক সময়ে এই ধরনের একেক ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য জনগণকে আরো আতংকের মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে।