ফ্যাক্ট চেকস
তুরাগে অন্তত ৩ জনের লাশ উদ্ধার, পুলিশ বললো ‘গুজব’!
বিভ্রান্তিকর

তুরাগে অন্তত ৩ জনের লাশ উদ্ধার, পুলিশ বললো ‘গুজব’!

তুরাগ নদীতে পুলিশ এবং বিএনপি কর্মীর আক্রমনে ৭ জন ছাত্রলীগ এবং আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিহত হওয়ার দাবি সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আওয়ামী লীগের অফিসিয়াল পেইজ থেকে সাবেক এমপি মুহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের একটি পোস্ট শেয়ার করা হয়েছে যেখানে নওফেল শুধু তুরাগে হামলায় তিনজন নিহত এবং ৪ জন নিখোঁজের দাবি করেছেন।

একইভাবে অ্যাক্টিভিস্ট NahidRains দাবি করেন তুরাগ নদীতে ৭ জনকে মেরে ফেলে দেওয়া হয়েছে। ভিডিও

পুলিশ বললো ‘এসব ভিত্তিহীণ’

এ বিষয়ে বাংলাদেশ পুলিশ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি অফিসিয়াল বিবৃতি দিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, “তুরাগ নদীতে ভাসছে আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের সাত নেতা-কর্মীদের লাশ শিরোনামে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিত্তিহীন তথ্য প্রচার করে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে, এ ধরনের কোন ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। এ ধরনের মিথ্যা অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য সকলের প্রতি বাংলাদেশ পুলিশ অনুরোধ জানাচ্ছে।”

এছাড়াও কেউ এ ধরনের অপপ্রচারে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও পুলিশ জানায়। পুলিশের বিবৃতি 

 

ফ্যাক্ট-চেক জোনের অনুসন্ধান

পুলিশ সম্পূর্ণ ঘটনাটিকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করলেও, অন্তত ৩ জন ব্যক্তি তুরাগ নদীতে ডুবে নিহত হওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করেছে ফ্যাক্ট-চেক জোন।

২২ জুন অন্তত ১৪ জনকে পুলিশ গ্রেফতার করে। এ সময় ঘটনাস্থলে বিএনপির নেতাকর্মীদের উপস্থিতি সম্পর্কেও নিশ্চিত হয়েছে ফ্যাক্ট-চেক জোন।

একই দিন (২২ জুন) দুপুরে যুবলীগ এবং ছাত্রলীগের একটি দল ট্রলারে শপথ নেয়ার ভিডিও ফ্যাক্ট-চেক জোন এর হাতে এসেছে যা আওয়ামী লীগের অফিসিয়াল পেজেও পাওয়া যায়। ভিডিও লিংক

এই ভিডিওতে থাকা দলের ব্যক্তিরাই সেদিনই পুলিশের হাতে শপথ শেষে ঘাটে গ্রেফতার হয়েছেন । সেসময় বিএনপির নেতারা ও পুলিশ ধাওয়া দিলে আতঙ্কে অনেকেই নদীতে ঝাঁপ দেন।

ফ্যাক্ট-চেক জোন যাচাই করে দেখেছে সংবাদমাধ্যেমে প্রকাশিত ছবিতে ২২ জুন  গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিদের পোশাক এবং শপথ নেয়ার মুহূর্তের পোশাক একই, যা দেখে ধারণা করা যায় ২২ জুন শপথের শেষেই এরা আটক হয়। সেই শপথে সুমনকেও দেখা যায়। পরবর্তীতে এই সুমনেরই লাশ নদী থেকে উদ্ধার হয়।

অথচ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে সুমনের এই মৃত্যুকে বন্ধুদের নিয়ে পিকনিকে যাওয়ার পথে ট্রলার থেকে পড়ে মৃত্যু বলে দাবি করা হয়েছে। দেখুন এখানে,এখানে।

এমনকি যমুনা টিভি সুমনের মৃত্যুকে তাজিয়া মিছিলের ঘটনা বলেও দাবি করেছে!

জানা গেছে সুমনের পরিবার একটি অপমৃত্যুর মামলা করেছেন, যেখানে মামলার বিবরণেও পিকনিকে যাওয়ার পথে ট্রলার থেকে পড়ে মৃত্যু দাবি করা হয়েছে। তবে এই বিষয়ে পরিবারের কাছে বিস্তারিত জানতে চাওয়া হলে তারা মুখ খুলতে চাননি।

নিহত সুমন

 

সেই শপথে সুমন

সুমন ছাড়া নিহত যে ২ জনের তথ্য ফ্যাক্ট-চেক জোন এর হাতে এসেছে তারা হল- আরিফুল ইসলাম আরিফ (২২) এবং বিপ্লব।নিহত আরিফুল ইসলামের বাবা আব্দুল হাই জানান, “আমার ছেলে ২২ জুন ঘুরতে গিয়েছিল। এর কিছুক্ষণ পর জানতে পারি, তাদেরকে বিএনপির নেতারা ও পুলিশ ধাওয়া দিয়েছে। এতে আতঙ্কে সবাই নদীতে ঝাঁপ দেয়। সবাই উঠতে পারলেও আরিফ উঠতে পারেনি।”

আরিফের মামাতো ভাই ফারুক হোসেন বলেন, “নিহত আরিফ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আগের দিন তারা নৌকাযোগে মিছিল বের করে। এ সময় পুলিশ ও বিএনপির নেতাকর্মীদের ধাওয়ায় এ ঘটনা ঘটে।” আরিফের বাবা এবং ভাইয়ের বক্তব্য

নিহত আরিফুল

২৪ তারিখে উদ্ধারকৃত বিপ্লবের লাশ

 

সোশ্যাল মিডিয়ায় দাবীকৃত নিখোঁজ ৪ জনের মধ্যে তুরাগ থানা শ্রমিক লীগের সভাপতি মামুন হোসেন এর নিখোঁজ থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে ফ্যাক্ট-চেক জোন। নিখোঁজ দাবীকৃত অন্য ৩ জনের পরিচয় বা সত্যতা সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

এদিকে সেদিন সুমন এবং আরিফ, এই ২ জন নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে পুলিশের অভ্যন্তরীন একটি সূত্র। তবে বিপ্লবের নিহত হওয়ার বিষয়টি পুলিশের সেই সূত্র নিশ্চিত করেনি, যা ইতিমধ্যেই ফ্যাক্ট-চেক জোন নিশ্চিত করেছে।

ইতিমধ্যেই একাধিক মিডিয়া ২ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। দেখুন 

পুলিশ সূত্র জানায়, “২২জুন দুপুর ৩টার দিকে তুরাগ থানা ছাত্রলীগের প্রায় ৩০ জন নেতাকর্মী নৌকায় রুস্তমপুর ঘাট হতে আশুলিয়া বাজার ঘাটে মিছিল করার উদ্দেশ্যে আসে। তারা ঘাটে পৌছামাত্র সেখানে পূর্বেই উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা  ধাওয়া করে। এ সময় তারা আবার নৌকায় উঠে পালানোর চেষ্টা করে। এ সময় পুলিশ নৌকার নোঙর ধরে ফেলে এবং ঘটনাস্থল থেকে মোট ০৭ (সাত) জনকে আটক করে। নৌকায় থাকা বাকি নেতাকর্মীরা আত্মরক্ষার্থে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।

পুলিশের ভাষ্য তীব্র স্রোত থাকায় পালিয়ে যাওয়ার সময় ০২ (দুই) জন (সুমন এবং আরিফ) তলিয়ে যায় যা তাৎক্ষণিকভাবে কেউই জানতে পারে নাই । পরে তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

অথচ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রহস্যজনকভাবে পুরো বিষয়টিকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে পুলিশ যা প্রকৃত পরিস্থিতির সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।

আরও পড়ুন
আওয়ামী লীগের মিছিল থেকে নিহত যুবককে তাজিয়া মিছিলে নিহত বলে প্রচার করলো যমুনা টিভি!

আওয়ামী লীগের মিছিল থেকে নিহত যুবককে তাজিয়া মিছিলে নিহত বলে প্রচার করলো যমুনা টিভি!