ফ্যাক্ট চেকস
পলাশবাড়ীতে রাম মূর্তি: ডানপন্থীদের ক্রমাগত উসকানিমূলক পোস্ট, জুলকারনাইন বললেন ‘আওয়ামী লীগ’
সাইবার সচেতনতা

পলাশবাড়ীতে রাম মূর্তি: ডানপন্থীদের ক্রমাগত উসকানিমূলক পোস্ট, জুলকারনাইন বললেন ‘আওয়ামী লীগ’

গাইবান্ধায় নির্মিত বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ রাম মূর্তি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উদ্বেগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একাধিক পেইজ, প্রোফাইল এবং একটিভিস্টরা ক্রমাগত ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ প্রচার করে  সাম্প্রদায়িক উসকানির সৃষ্টি করছে।

এই মন্দিরে আওয়ামী লীগ উগ্রবাদীদের হামলার ‘নাটক’ সাজাচ্ছে দাবি করে সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের সামাজিক যোগাযোগ লিখেছেন”নিষিদ্ধ গোষ্ঠী (আওয়ামী লীগ) ও তাদের সহযোগীদের প্রচেষ্টা সমূহের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে নির্মিতব্য রামচন্দ্র মূর্তি কে কেন্দ্র করে হিন্দু-মুসলিম সংঘাত, মুসলিম কর্তৃক হিন্দুদের উপর আক্রমণের জন্য উস্কানি প্রদান। সাম্প্রতিক সময়ে এসকল বিষয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় টার্গেটেড প্রোপাগান্ডা চলমান রয়েছে।

যেসকল ব্যক্তিবর্গ এই সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে মূল ভূমিকা রাখছেন, তাদের কয়েকজনের নাম জানা গেছে।

ক) দেশের বাইরে অবস্থান করে (সম্ভাব্য কলকাতা) যুবলীগের জনৈক নেতা সুভাষ
খ) ফিরোজুর রহমান অলিউ (এরাম, পিকক, ড্রাগন বারের মালিক; স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক বাংলাদেশের অন্যতম উদ্যোক্তা ও পরিচালক)
গ) ফিরোজুর রহমান অলিউ এর মেজ ছেলে হিরা

তথ্যানুযায়ী নির্দিষ্ট গোষ্ঠীটি রংপুরের রামকৃষ্ণ আশ্রম ও রামকৃষ্ণ মিশন, পলাশবাড়ীতে নির্মিতব্য রামচন্দ্র মূর্তি, বগুড়া জেলার অন্তর্গত বিভিন্ন হিন্দু পাড়া, ভবানীপুর (শেরপুর) সহ ঢাকা এবং চট্টগ্রামে হিন্দুধর্মালম্বীদের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থান লক্ষ্য করে চোরাগোপ্তা হামলার পরিকল্পনা করছে। ”
এছাড়াও তিনি এই ধরনের ষড়যন্ত্রমূলক কাজে ‘পার্শ্ববর্তী একটি দেশ’ জড়িত থাকতে পারে বলে আশংকা প্রকাশ করেছেন। পোস্ট লিংক

সায়ের এর পক্ষ থেকে “পলাশবাড়ীর রামমূর্তি নিয়ে কতিপয় আওয়ামী লীগ নেতার উসকানিমূলক প্রপাগান্ডা প্রচার এবং নাটক সাজানো”র দাবি করা হলেও ফ্যাক্ট-চেক জোন এর অনুসন্ধানে দেখা গেছে ভিন্ন এক চিত্র। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অতি সুপরিচিত একটি চক্র সংঘবদ্ধভাবে ক্রমাগত উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটিয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের রসদ যোগাচ্ছে।

সেনাবাহিনীর বহিষ্কৃত কর্মকর্তা কর্ণেল হাসিনুর সরকারকে মূর্তি সরানোর আহ্বান নিয়ে লিখেছেন “মূর্তি থাকবে মন্দিরের ভিতরে, বাহিরে নয়। সরকারের হস্তক্ষেপ জরুরী কাম্য। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্য জনগণ কে দোষারোপ করবেন না।” দেখুন

সেনাবাহিনীর আরেক বহিষ্কৃত কর্মকর্তা Del H Khan লিখেছেন, “দেশের সম্মানিত আলেম উলামাদের কাছে জানতে চাইঃ
ভারতে যখন একের পর এক মসজিদে তালা ঝোলানো হচ্ছে, তখন বাংলাদেশে অতিকায় রাম কিংবা শিবের মুর্তির প্রদর্শন কি বেশি দৃষ্টিকটু?
নাকি এই ব্যাপারে জামাতের নিরবতা বেশি দৃষ্টিকটু?”দেখুন

পলাশবাড়ির এই মন্দিরে ভারতীয় হাইকমিশনারের সম্পৃক্ততাকে প্রশ্ন করে পিনাকী ভট্টাচার্য লিখেছেন, “(এই এলাকায়) হিন্দু জনসংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬.৪%, আর মুসলিম ৯২.৪৮%। তার মানে সবচেয়ে কম হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা এইটা। তবে স্ট্রাটেজিক লোকেশনটা দেখেন। আমাদের দেশের জন্য ভৌগোলিক ভাবে নাজুক একটা জায়গা। এতো বড় বড় স্থাপনা, মুর্তি করার অর্থায়ন কোথায় থেকে আসছে? আমাদের গোয়েন্দারা কি এই সংবেদনশীল নাজুক ভৌগোলিক জায়গায় একের পর এক সুবিশাল মুর্তি বসানোর বিষয়টা ক্রিটিক্যালি এনালাইজ কর্ছেন?” দেখুন

এই একই পোস্ট কপি পেস্ট করেছেন সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উসকানিমূলক পোস্ট করে গ্রেফতার হওয়া জামাতপন্থী একটিভিস্ট বিবি সাওদা সুমিদেখুন

‘বহুল আলোচিত’ একটিভিস্ট পিনাকীর এমন বক্তব্য এর পরপরই বিভিন্ন ইসলামপন্থী এবং ডানপন্থী মতাদর্শে বিশ্বাসী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের মধ্যে বিষয়টি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপ, পেজ এবং ব্যক্তিগত আইডি থেকে রামমূর্তি নির্মাণের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া হয়। কিছু পোস্টে কঠোর আন্দোলন, বিক্ষোভ, এমনকি লংমার্চের ডাকও দেওয়া হয়।

সদ্য জেল থেকে ছাড়া পাওয়া আতাউর রহমান বিক্রমপুরী সবাইকে রুখে দাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে লিখেছেন, ” পলাশবাড়ীর রামমূর্তি দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য এলার্ট” দেখুন 

আলেম ওলামা ঐক্য পরিষদ নামক পেজ থেকে ৪৮ ঘন্টার মূর্তিটি ভেঙে ফেলার আল্টিমেটাম দেওয়া হয়েছে৷ পেজটির ফলোয়ার প্রায় দেড় লক্ষ৷ দেখুন

Rabbaetul Barat নামক এক ইসলামিক একটিভিস্ট লিখেছেন, ” আমরা মিল্লাতে ইবরাহিমের সন্তান। আমরা মূর্তি ভাঙার জন্য জন্মেছি, পাহাড়া দেয়ার জন্য নয়। “, দেখুন 

এরকম হাজার হাজার পেজ, গ্রুপে এরকম প্রচারণা চলমান আছে।

কেবল অনলাইনেই নয়, অফলাইনে প্রকাশ্যে এই ধরনের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড লক্ষ্য করা জাচ্ছে।‘ইনসাফ কায়েমকারী ছাত্র শ্রমিক জনতা’ নামক একটি সংগঠন  রামের সেই মূর্তিকে বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়ে দেয়া হবে বলে প্রকাশ্যে হুমকি দিয়েছে। দেখুন 

 

রাম মূর্তি গুড়িয়ে দেয়ার বক্তব্য দিচ্ছেন বক্তা

মন্দির কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

মন্দির কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, এটি তাদের নিজস্ব জমিতে নির্মিত একটি ধর্মীয় স্থাপনা এবং এর সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বা বিদেশি প্রভাবের সম্পর্ক নেই। মন্দিরের মূল উদ্যোক্তা হরিদাস পালকে নিয়েও বেশ কিছু বিতর্ক রয়েছে। অতীতে হরিদাসকে প্রতারণার দায়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তবে তিনি দাবি করেন, তাকে অতীতে বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে এবং একাধিক সরকারি সংস্থা তার বিষয়ে তদন্ত করলেও কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ জরুরি

বিষয়টি নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বিবৃতি জরুরি। প্রয়োজনে যেসব বিষয় নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে তা নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত একটি তদন্ত হওয়া জরুরি। অভিযোগসমূহ মিথ্যা হলে, অনলাইন অফলাইনে যারা ক্রমাগত উসকানি সৃষ্টি করছে তাদের আইনের আওতায় আনা জরুরি। অন্যথায় সরেজমিন এবং অনলাইনে বিষয়টি নিয়ে যে পরিমাণ জলঘোলা হয়েছে, তা দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে হুমকির সম্মুখীন করছে।