ফ্যাক্ট চেকস
“দশ বছর ধরেই টিকাদানের হার কম ছিল”- টকশোতে আসিফ মাহমুদের মিথ্যা তথ্য!
ফ্যাক্ট চেক

“দশ বছর ধরেই টিকাদানের হার কম ছিল”- টকশোতে আসিফ মাহমুদের মিথ্যা তথ্য!

সম্প্রতি বেসরকারি একটি টিভি চ্যানেলে অন্তর্বর্তী সরকারের হামের টিকা অব্যবস্থাপনা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সাবেক উপদেষ্টা এবং এনসিপি নেতা আসিফ মাহমুদ বলেছেন “আমি পরিসংখ্যান নিয়ে দেখেছি, হামের বিষয়টা নিয়ে অবহেলা শুরু হয়েছে বিগত দশ বছর ধরেই। এবং তখন থেকেই এই টিকাদানের হার স্ট্যাটিকসটিকালি কমতে কমতে অন্তর্বর্তী আমলে অনেকটাই কমে এসেছে। এবং এই ধারাবাহিকতায় এখন এসে হামে অনেক শিশু মৃত্যুবরণ করেছে।” দেখুন ভিডিওর ২১.৫০-২৩.১০

তবে বাস্তবে আসিফ মাহমুদের এই সব দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা!

ফ্যাক্ট-চেক জোনের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিগত দশ বছর হামের টিকা দানের হার কমেনি। বরং উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের টিকাদান সম্পর্কিত কর্মসূচি ইপিআইয়ের ডাটাবেজের তথ্য অনুযায়ী ২০১৭,২০১৮ এবং ২০১৯ এই ৩ বছর হামের টিকাদানের হার ছিল ৮৫-৯০ শতাংশ।

২০২০ সালে কোভিডের বছরে স্বাভাবিক টিকাদান কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ায় এই হার কমে আসে। তবে সেই বছরও প্রায় ৮২ শতাংশ টিকা দেয়া হয়।

২০২১, ২০২২ সালে হামের টিকা কভারেজের পরিমাণ ৯৫ শতাংশেরও বেশি ছিল। ২০২৩ ও ২৪ সালেও এই হার ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশের মধ্যে ছিল।

অর্থাৎ ২০১৭ থেকে ২০২৪ অব্দি গড়ে ৮৫-৯০% টিকা কাভারেজের মাধ্যেম বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছিল।

কিন্তু ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার আমলে এমআর-১ টিকার কভারেজ নেমে আসে ৫৬ দশমিক ৫ শতাংশে এবং এমআর-২ টিকার কভারেজ ৫৭ দশমিক ১ শতাংশে। দেখুন এখানে। 

তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ২০২৫ এর টিকার ডাটাকে অসম্পূর্ণ দাবি করে ইতিমধ্যেই সেই তথ্য ডাটাবেজ থেকে মুছে দেয়া হয়েছে।

 

বাংলাদেশের টিকা কার্যক্রম নিয়ে প্রশংসা ছিল আন্তর্জাতিক মহলেও

২০২৫ সালের এপ্রিলে GAVI, Unicef, World Bank এর যৌথ বিবৃতিতে বাংলাদেশের প্রশংসা করে বলা হয়,”১৯৭৯ সালে ইপিআই চালু হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছে—সম্পূর্ণ টিকাপ্রাপ্ত শিশুর আওতা মাত্র ২% থেকে বাড়িয়ে ৮১.৬%-এ উন্নীত করেছে। এই সাফল্য বাংলাদেশের দৃঢ় অঙ্গীকার এবং সহযোগী সংস্থা, এনজিও ও মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের অক্লান্ত প্রচেষ্টার প্রতিফলন।” দেখুন

২০২৫ এর মে মাসে বাংলাদেশে GAVI’র টীম লিডার Nilgun Aydogan বলেন “কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশ টিকাদান কর্মসূচির প্রতি অবিচল রাজনৈতিক অঙ্গীকার প্রদর্শন করে আসছে এবং সেই অঙ্গীকারকে লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য বাস্তব স্বাস্থ্য সুফলে রূপান্তরিত করেছে। দেশটি যখন তার টিকাদান কর্মসূচির পূর্ণ স্ব-অর্থায়নের দিকে অবিচলভাবে এগিয়ে চলেছে, আমরা আত্মবিশ্বাসী যে জনস্বাস্থ্যে নেতৃত্ব ও বিনিয়োগের এই ঐতিহ্য আরও শক্তিশালী হবে।” দেখুন 

প্রসঙ্গত ২০১৯ সালে ভ্যাকসিন কার্যক্রমে সফলতার পুরষ্কার স্বরূপ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘Vaccine Hero Award’ দেয় GAVI। সে সময় তারা শেখ হাসিনার প্রশংসা করে বিবৃতি দেয়,“শেখ হাসিনা টিকাদান কর্মসূচির একজন প্রকৃত অগ্রদূত। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ টিকাদান ও শিশু স্বাস্থ্যে অভূতপূর্ব অগ্রগতি অর্জন করেছে। দেশের অভ্যন্তরে তাঁর সরাসরি সম্পৃক্ততা—ব্যক্তিগতভাবে প্রতিটি প্রধান টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধন করা—থেকে শুরু করে বিশ্বমঞ্চে টিকাদান কর্মসূচির ধারাবাহিক পৃষ্ঠপোষকতা পর্যন্ত, প্রধানমন্ত্রী হাসিনা নিঃসন্দেহে একজন ভ্যাকসিন হিরো। তাঁর মতো নেতাদের সঙ্গে অংশীদারিত্ব ছাড়া গাভির এই সাফল্য সম্ভব হতো না।” দেখুন

২০২৫ সালের আগস্টে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ফাউন্ডেশন বেশ কিছু তথ্য তুলে ধরে। তারা জানায়, “বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচি (EPI) জনস্বাস্থ্যে বৈশ্বিক সাফল্যের নজির স্থাপন করেছে। গত দুই দশকে ৫ কোটিরও বেশি শিশুকে টিকা দেওয়ার মাধ্যমে প্রতিবছর প্রায় ৯৪ হাজার শিশুর মৃত্যু রোধ করা সম্ভব হয়েছে। একইসঙ্গে ৫ বছরের নিচে শিশু মৃত্যুহার ৮১.৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে—যা বাংলাদেশসহ মাত্র ছয়টি দেশ অর্জন করেছে।” 

 

অন্তর্বতী সরকারকে বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও অবহেলা:

অন্তর্বর্তী সরকারের টিকা অব্যবস্থাপনার কারণে সম্ভাব্য বিপর্যয় নীয়ে স্বাস্থ্য সুরক্ষা ফাউন্ডেশন থেকে সেসময়ই সরকারকে সতর্ক করে বলা হয়, “বাজেট বরাদ্দে দেরি, ৫ম এইচপিএনএসপি বাতিল এবং নতুন উন্নয়ন প্রকল্প (ডিপিপি) অনুমোদন না হওয়ায় টিকা ক্রয় ও পরিবহনে জটিলতা তৈরি হয়েছে। এমনকি সেপ্টেম্বরের মধ্যে অর্থ ছাড় না হলে ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে টিকার মজুদ সংকট দেখা দিতে পারে।” দেখুন

ইউনিসেফের ‘Situation Report-Measles Outbreak’ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে “বাংলাদেশে টিকাদানের ভালো ইতিহাস থাকলেও, ইউনিসেফের বারবার আহ্বানের পরও ২০২৪ ও ২০২৫ সালে MR1 এবং MR2 টিকাদানে বিঘ্ন ঘটায় ধীরে ধীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়েছে।” দেখুন ইউনিসেফের প্রতিবেদন

সমস্ত তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, বিগত বছরগুলো থেকে শুরু করে ২০২৪ পর্যন্ত হামের টিকা দানে বাংলাদেশ দারুণ অগ্রগতি অর্জন করেছিল। ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী আমলেই বরং হামসহ সমস্ত টিকা কার্যক্রম ব্যহত হয়েছে।

ফ্যাক্ট-চেক জোন সিদ্ধান্ত: “দশ বছর ধরেই টিকাদানের হার কম ছিল”- আসিফ মাহমুদের এ দাবিটি মিথ্যা!