ফ্যাক্ট চেকস
ড. ইউনুসকে হেনস্তা; সরকারি বিবৃতি দিয়ে ৪ বার এডিট করলো পররাস্ট্র মন্ত্রণালয়!
বিভ্রান্তিকর

ড. ইউনুসকে হেনস্তা; সরকারি বিবৃতি দিয়ে ৪ বার এডিট করলো পররাস্ট্র মন্ত্রণালয়!

সম্প্রতি নিউইয়র্কের জেএফকে বিমানবন্দরে প্রবাসী আওয়ামীপন্থী বাঙালীদের প্রতিবাদের মুখে পড়েন ইউনুস। এ ঘটনায় গতকাল (১৩ অক্টোবর) বিকাল ৫টা ২৮ মিনিটে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে অফিসিয়াল বিবৃতি প্রকাশ করে নিন্দা জানায় পররাস্ট্র মন্ত্রণালয়।

তবে এটি প্রকাশের পরপর অফিসিয়াল  বিবৃতিতে আন-অফিশিয়াল ভাষার প্রয়োগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার সৃষ্টি হয়। এই সমালোচনার পরপরই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (MoFA) তাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে যে বিবৃতিটি প্রকাশ করেছিল, তাতে মাত্র দেড় ঘণ্টার ব্যবধানে ৪ বার বড় ধরনের পরিবর্তন ও পরিমার্জন আনে!

একটি রাষ্ট্রে কূটনৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক বিবৃতিতে সাধারণত অত্যন্ত সতর্ক শব্দচয়ন করা হয়। কিন্তু এই ক্ষেত্রে বারবার ‘ডিলেট ও এডিট’ করার ঘটনাটি নেটিজেনদের নজর কাড়ে। ৪ বারের সংশোধনীতে ঠিক কী কী বদলাল, তার একটি তুলনামূলক  বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো:

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ নাকি নিষিদ্ধ নয়?

২০২৫ এর ১২মে সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুসারে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের উপর নিষেধাজ্ঞা  দেয়া হয়েছিল। তবে গতকাল বিকাল ৫.২৮ ও ৫.৪৩ এ প্রকাশিত ১ম ও ২য় সংস্করণ বিবৃতিতে  আওয়ামী লীগকে সরাসরি “banned political outfit” (নিষিদ্ধ রাজনৈতিক সংগঠন) হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।

বিষয়টি নিয়ে আলোচনা সৃষ্টি হলে বিকাল ৬.১৩ ও ৬.৫৫ (৩য় ও ৪র্থ ) সংস্করণে  পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয় কর্তৃক  “banned political outfit” (নিষিদ্ধ রাজনৈতিক সংগঠন) শব্দগুলো বদলে দিয়ে এর জায়গায় “suspended terror political outfit” (স্থগিতকৃত সন্ত্রাসী রাজনৈতিক সংগঠন) লেখা হয়! অর্থাৎ, পূর্বে ‘নিষিদ্ধ’ শব্দটি ব্যবহার করা হলেও পরে সেটিকে ‘স্থগিত’ দেখানো হয়েছে। তবে আপডেটেড সংস্করণের সরকারি বিবৃতিতে একটি রাজনৈতিক দলকে আদালতের রায় ছাড়াই ‘সন্ত্রাসী রাজনৈতিক সংগঠন’ হিসেবে উল্লেখ করতে দেখা গেছে।

প্রথম সংস্করণ ( চিহ্নিত অংশগুলো শেষ সংস্করণে বাতিল করা হয়েছে)

দ্বিতীয় সংস্করণ ( চিহ্নিত অংশগুলো শেষ সংস্করণে বাতিল করা হয়েছে)

 

বিকাল ৫.২৮ এ প্রকাশিত প্রথম বিবৃতিতে একটি সম্পূর্ণ বাক্য ছিল— “The Government of Bangladesh hopes that Bangladeshi diaspora living abroad will refrain from such misconduct in future towards respected figures of Bangladesh.” (বাংলাদেশ সরকার আশা করে যে বিদেশে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সম্মানিত ব্যক্তিদের প্রতি এই ধরনের অসদাচরণ থেকে বিরত থাকবেন)। মাত্র ১৫ মিনিটের মাথায় ২য় সংস্করণেই এই পুরো বাক্যটি সম্পূর্ণ কেটে বাদ দেওয়া হয়।

 

কূটনৈতিক মিশনের ঠিকানা বিভ্রাট:

বিকাল ৫.২৮ ও ৫.৪৩ (১ম ও ২য় সংস্করণ)এর  বিবৃতিতে স্পষ্ট নির্দেশ ছিল— “asked its Mission in New York to take up the matter…” (নিউইয়র্কের মিশনকে স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সাথে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে)।

বিকাল ৬.১৩ ও ৬.৫৫ (৩য় ও ৪র্থ সংস্করণ) এর বিবৃতিতে New York  পরিবর্তন করে লেখা হয়— “asked its Mission in USA to take up the matter…”।

ড. ইউনুসের ‘সম্মান’ বিভ্রাট

১ম ও ২য় সংস্করণে ড. ইউনূসের ক্ষেত্রে “Nobel Peace Prize laureate… who is highly respected by the international community, in a foreign soil” বাক্যটি ছিল।

৩য় ও ৪র্থ সংস্করণে আন-অফিশিয়াল শব্দে ভরা বাক্যটিকে ছোট করে “Nobel Peace laureate… a highly respected personality in the international community” করা হয়

রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন সম্পর্কিত বাক্য বাদ

১ম ও ২য় সংস্করণে “tarnished the image of Bangladesh and all its citizens before the world” (বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশ ও তার সকল নাগরিকের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে) কথাটি যুক্ত ছিল।

৩য় ও ৪র্থ সংস্করণে “ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার” আবেগঘন ও আন-অফিশিয়াল লাইনটি সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে সাধারণ আইনি ভাষায় শেষ করা হয় (“…identify the perpetrators and take due actions against those.”)।

চূড়ান্ত সংস্করণ ( চিহ্নিত অংশগুলো সংযুক্ত বা সংশোধন করে বসানো হয়েছে)

উল্লেখ্য ৩য় সংস্করণের সাথে ৪র্থ সংস্করণের লেখার কোনো তফাত নেই।

 

ঘনঘন এডিটের নজির আগেও দেখা গেছে

এর আগেও গত ৫ আগস্ট দিল্লীতে একটি প্রেস কনফারেন্সে শেখ হাসিনার বক্তব্যের প্রতিবাদে বিবৃতি প্রকাশ করে বাংলাদেশ। সেই বিবৃতিতে মোট ১০ বার পরিবর্তন আনা হয়।  আশ্চর্যজনকভাবে শেষ পরিবর্তনটি ছিল মূল বিবৃতি দেয়ার ৪ দিন পরে, ৯ আগস্ট!

 

রাষ্ট্রীয় ও কূটনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে যেকোনো অফিসিয়াল বিবৃতি প্রকাশের আগে কয়েক স্তরের সতর্ক যাচাই-বাছাই ও প্রফেশনাল সম্পাদনা নিশ্চিত করা একটি সাধারণ নিয়ম। তবে এই ধরনের অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি আন্তর্জাতিক বিষয়ে মাত্র দেড় ঘণ্টার মধ্যে চার চারবার এডিট ও ড্রাফট পরিবর্তন করা প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা ও যথাযথ পেশাদারীত্বের অভাবের বহিঃপ্রকাশ, যা বিশ্ব দরবারে দেশের কূটনৈতিক ভাবমূর্তিকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।