ফ্যাক্ট চেকস
চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতাকে অস্বীকার করে সংসদে প্রতিমন্ত্রীর ‘অসত্য’ ভাষণ! মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় ফজলুর রহমানের নাম না থাকার দাবিটি গুজব! ‘ভুয়া’, ‘নিবন্ধনহীন’ পোর্টালকে সূত্র ধরে রুপপুরে ৫ বিলিয়ন ডলার দুর্নীতির দাবি গণমাধ্যমে! বিএনপি সরকারের ২ মাসেই রাডার! ‘ভারতের হাতে বাংলাদেশের আকাশ’ সহ একাধিক গুজবের ‘ঝড়’! ‘অস্তিত্বহীন’ টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে স্পীকারের ভুল তথ্য, সংবাদমাধ্যমে ‘মিথ্যা’ ছবি প্রচার ইউনিসেফের লেটার প্যাডে ভুয়া অপ্রাসঙ্গিক চিঠি, ‘অন্তর্বর্তী সরকার আমলে ১ হাজার কোটি টাকার টিকা আমদানি’র গুজব ছড়ালেন পিনাকী ব্যারিস্টার ফুয়াদের গলায় ‘জুতার মালা’ পরিয়ে ঘোরানোর ছবিটি এআই
ইউনিসেফের লেটার প্যাডে ভুয়া অপ্রাসঙ্গিক চিঠি, ‘অন্তর্বর্তী সরকার আমলে ১ হাজার কোটি টাকার টিকা আমদানি’র গুজব ছড়ালেন পিনাকী
ফ্যাক্ট চেক

ইউনিসেফের লেটার প্যাডে ভুয়া অপ্রাসঙ্গিক চিঠি, ‘অন্তর্বর্তী সরকার আমলে ১ হাজার কোটি টাকার টিকা আমদানি’র গুজব ছড়ালেন পিনাকী

সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকার আমলে টিকা আমদানি হয়নি৷ এ দাবির বিরুদ্ধে কনটেন্ট ক্রিয়েটর পিনাকী ভট্টাচার্য তারেক রহমানকে উদ্দেশ্য করে লিখেন, “এতো দেখি হাসিনার চাইতেও বেশী মিছা কথা বলে।”

ছবি- পিনাকীর স্ট্যাটাস

তার দাবি অন্তর্বর্তী সরকার ১ হাজার কোটি টাকার টিকা আমদানি করেছিল৷এর বিপরীতে প্রমান হিসেবে বেশ কয়েকটি নথিও তিনি তার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করেছেন। দেখুন

তবে ফ্যাক্ট-চেক জোনের অনুসন্ধানে পিনাকীর দেয়া তথ্যে একাধিক গোঁজামিল লক্ষ্য করা গেছে।

মন্ত্রীসভা কমিটির অনুমোদনের আগেই টিকা সরবরাহের দাবি!

পিনাকী তার পোস্টে ২টি দাপ্তরিক চিঠি উপস্থাপন করেছেন।

একটি চিঠি ২০২৫ এর ১৭ নভেম্বরে স্বাস্থ্য অধিপ্তরের প্যাডে মন্ত্রীসভা বরাবর পাঠানো হয়৷ আরেকটি তারও ২ মাস আগের, ২৪ সেপ্টেম্বরে৷ ইউনিসেফ চিলড্রেনস ফান্ড এর প্যাডে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বরাবর৷

১৭ নভেম্বর, ২০২৫ তারিখে APVAX প্রোগ্রামের পরিচালক ডাঃ আবু হেনা রায়হানুজ্জামানের সাক্ষরিত পত্রে দেখা যায়, মন্ত্রীসভা কমিটি বরাবর ৪৯.৯২ মিলিয়ন ডলার টিকা ক্রয়ের অনুমোদনের আবেদন করা হয়, যা বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৬১০ কোটি টাকা। পরবর্তীতে ৬ জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখে সংবাদমাধ্যম থেকে জানা যায় ৬১০ কোটি টাকার টিকা কেনার অনুমোদন দিয়েছে সরকার। দেখুন

 

এর ২ মাস আগেই ২৪ সেপ্টেম্বর,২০২৫ এ তারিখে সাক্ষরিত ইউনিসেফের লেটার প্যাডে আরেকটি দাপ্তরিক চিঠি শেয়ার করেছেন পিনাকী৷ ওই চিঠি হতে জানা যায়, ২০২৫ এর ১২ আগষ্ট থেকে ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যেই ৪.৯৯৬ মিলিয়ন ডলারের টিকা সরবরাহ করেছে ইউনিসেফ। এর বিপরীতে বিল পরিশোধের জন্য তারা ব্যাংক ডিটেইলস শেয়ার করে এবং উক্ত বকেয়া সেপ্টেম্বরের মধ্যেই পরিশোধের অনুরোধ জানায়।

মন্ত্রীসভার অনুমোদনের ৪ মাস আগেই ইউনিসেফ থেকে টিকা সরবরাহের দাবি বিভ্রান্তিকর৷ যা সরকারি দাপ্তরিক নিয়ম কিংবা আন্তর্জাতিকভাবে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে ক্রয় প্রক্রিয়া অনুসারে অসম্ভব৷ এমনকি ইউনিসেফ সেপ্টেম্বরের মধ্যেই বিল পরিশোধের নির্দেশনা দিলেও, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তরফ থেকে নভেম্বরে মন্ত্রীসভার অনুমোদন চাওয়াটাও অসঙ্গতিপূর্ণ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পত্র অনুযায়ী ক্রয় চাহিদা ২০২৫-২৬ সালের। অন্যদিকে  কথিত ইউনিসেফের চিঠিতে অবশ্য উল্লেখ করা হয়েছে ২০২৪-২৫ (৩য় প্রান্তিক) এর চাহিদার ভিত্তিতে সরবরাহ করা হয়েছে। তাই সরকারি ৬১০ কোটি টাকার ক্রয় চাহিদার সাথে কথিত এই ইউনিসেফের চিঠি সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক। বরং ইউনিসেফের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে ২০২৪-২৫ সালে সময়মতো টিকা ক্রয় করেনি সরকার।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের হাম পরিস্থিতি নিয়ে ৮ই এপ্রিল,২০২৬ তারিখে ‘Situation Report-Measles Outbreak’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে ইউনিসেফ৷ উক্ত প্রতিবেদনের ৪র্থ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয় ৩০ মার্চ,২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ সরকার ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা ক্রয়ের জন্য ৪৯.৩ মিলিয়ন ডলারের তহবিল বরাদ্দ দিয়েছে৷

ছবি- ইউনিসেফের প্রতিবেদন

পিনাকির দাবির সাথে মিলেনি বিল ভ্যালু

পিনাকি দাবি করেছেন ১ হাজার কোটি টাকার টিকা ক্রয় করেছে অন্তর্বর্তী সরকার৷ তবে ইউনিসেফের বিল ভ্যালু কিংবা মন্ত্রীসভার অনুমোদনের পত্র অনুযায়ী কোনটিতেই ১ হাজার কোটি টাকার  অস্তিত্ব পাওয়া যায় নি৷ কথিত ইউনিসেফের চিঠির বিল অনুযায়ী টিকার দাম ছিল মাত্র ৬১ কোটি টাকা বা ৪.৯৯৬ মিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সূত্রমতে টিকার চাহিদা ৬১০ কোটি বা ৪৯.৯২ মিলিয়ন ডলারের৷ এর কোনটিই পিনাকীর দাবির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

অন্তর্বর্তী সরকার কি আসলেই টিকা আমদানি বন্ধ রেখেছিল?

একাধিক তথসূত্র বিশ্লেষণে অন্তর্বর্তী সরকার আমলে টিকা আমদানি বন্ধ থাকার প্রমাণ পেয়েছে ফ্যাক্ট-চেক জোন৷

দাতা সংস্থার সহায়তায় বাংলাদেশে ‘ওপি’র মাধ্যমে টিকা দেয়া শুরু হয় ১৯৯৮ সালে। এই ওপি কয়েক ধাপে গ্রহন করার পর, চতুর্থ কর্মসূচি (২০১৭-২২) শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২২ সালে। পরে সেই কর্মসূচি টেনে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত আনা হয়। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে পঞ্চম সেক্টর প্রোগ্রামের বিভিন্ন অপারেশন প্ল্যান তৈরির কাজ শুরু হয়।

তবে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেক্টর প্রোগ্রাম বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেয়। বেশ কয়েকটি সভা শেষে ২০২৫ সালের ৬ মার্চ ওপির মাধ্যমে টিকা কেনার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। মন্ত্রণালয় একবার সিদ্ধান্ত নেয় ইউনিসেফকে বাদ দিয়ে টিকা কিনবে। এতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আপত্তিতে আবার টিকা কেনায় ইউনিসেফকে যুক্ত করে। এসব করতে গিয়ে কয়েক মাস সময় চলে যায় এবং শেষমেশ ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এসে মন্ত্রীসভা সেই ৬১০ কোটি টাকার টিকা ক্রয়ের অনুমোদন দেয়৷ এভাবে নানা সিদ্ধান্তহীনতায় সময়ক্ষেপণ করে লম্বা সময় টিকা আমদানি বন্ধ করে রাখে অন্তর্বর্তী সরকার৷

বিস্তারিত 

অন্তর্বতী সরকারকে বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও অবহেলা:

ইউনিসেফের ‘Situation Report-Measles Outbreak’ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে “বাংলাদেশে টিকাদানের ভালো ইতিহাস থাকলেও, ইউনিসেফের বারবার আহ্বানের পরও ২০২৪ ও ২০২৫ সালে MR1 এবং MR2 টিকাদানে বিঘ্ন ঘটায় ধীরে ধীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়েছে।” দেখুন ইউনিসেফের প্রতিবেদন

ছবি- ইউনিসেফের প্রতিবেদন

সামগ্রিক তথ্য অনুসন্ধানে দেখা যায়, মন্ত্রীসভায় টিকা ক্রয়ের অনুমোদন দেয়া হয়েছে ২০২৬ এর জানুয়ারিতে৷ অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে মার্চের শেষে৷ এমনকি ইউনিসেফের অফিশিয়াল প্রতিবেদনেও স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে ইউনুস আমলে (২০২৪-২৫) টিকা কার্যক্রম ব্যহত হয়েছে। তাই ইউনিসেফের পক্ষ থেকে সময়মতো টিকা সরবরাহের দাবি অবান্তর।

ফ্যাক্ট-জোন সিদ্ধান্ত: ইউনিসেফের লেটার প্যাডে ভুয়া, অপ্রাসঙ্গিক চিঠি দিয়ে, সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব ছড়িয়েছেন পিনাকী ভট্টাচার্য