ফ্যাক্ট চেকস
‘পশ্চিমবঙ্গে মসজিদ থেকে খুলে নেয়া হচ্ছে মাইক!’-অর্ধসত্য খবর দিল চ্যানেল ২৪, আমার দেশ সহ একাধিক মিডিয়া জুলাই আন্দোলনে পুলিশ কি স্নাইপার রাইফেল ব্যবহার করেছিল? ৭.৬২’র প্রকৃত সত্য কি? ‘ভুয়া’ নথি দিয়ে সাতক্ষীরায় ভারতীয় সেনা অভিযানের ‘কাল্পনিক’ গল্প প্রচার! চট্টগ্রামের হাসপাতালের মোবাইল চোরকে নড়াইলের ছাত্রলীগ নেতা বলে প্রচার! ফাইনালে মেসির পরিবার অনুপস্থিত থাকার দাবিটি সত্য নয়! কথিত ‘মুক্তিযোদ্ধা’ জামাত এমপি গাজী নজরুলের নেই মুক্তিযোদ্ধা সনদ, সংসদে দাঁড়িয়ে করেন বিকৃত ইতিহাস প্রচার! আসামের শিক্ষক প্রশিক্ষণের ভিডিওকে বাংলাদেশের দাবি করে গুজব ছড়ালেন ‘আমার দেশ’ এর স্টাফ রিপোর্টার
‘ভুয়া’ নথি দিয়ে সাতক্ষীরায় ভারতীয় সেনা অভিযানের ‘কাল্পনিক’ গল্প প্রচার!
ফ্যাক্ট চেক

‘ভুয়া’ নথি দিয়ে সাতক্ষীরায় ভারতীয় সেনা অভিযানের ‘কাল্পনিক’ গল্প প্রচার!

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি ‘গোপন নথি’ ছড়িয়ে পড়েছে৷ নথিতে দেখা যায় ২০১৩ সালে বাংলাদেশের সাতক্ষীরায় ভারতীয় বাহিনীর ‘গোপন অভিযানের’ অনুমতি দান করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়৷ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্ণেল মোস্তাফিজুর তার ফেসবুক পোস্টে ‘গোপন’ ডকুমেন্টসটি আপলোড করে যা লিখেছেন তা হুবহু তুলে ধরা হল-,

“লেঃ কর্নেল তৌহিদ স‍্যারের স্ট্যাটাসের বাংলা অনুবাদঃ

আমি মতিউরকে বলেছিলাম, “একদিন তোমাকে এর জন্য কঠিন মূল্য দিতে হবে!”

মতিউর (লেফটেন্যান্ট জেনারেল, কমান্ডো অফিসার, সাবেক জিওসি ৫৫ ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশন ও যশোর এরিয়া কমান্ডার) নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করে আমাকে বলেছিলেন,

“স্যার, সাতক্ষীরা সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় বাহিনীর সীমান্ত অতিক্রম করে পরিচালিত ওই অভিযানের বিষয়ে আমাকে জানানোই হয়নি। মেজর জেনারেল তারেক আহমেদ সিদ্দিক অত্যন্ত গোপনে পুরো পরিকল্পনা করেন এবং আমাকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখেই এই অভিযানের নির্দেশ দেন।”

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে আমাদের তরুণ বয়স থেকেই আমরা মতিউরকে একজন আপসহীন কমান্ডো ও দেশপ্রেমিক হিসেবে চিনতাম।

আমি তখন মতিউরকে প্রশ্ন করেছিলাম,

“তুমি ভবিষ্যতে কীভাবে নিজের দায় এড়াবে, যখন ওই এলাকার (যশোর–সাতক্ষীরা) এরিয়া কমান্ডার তুমিই ছিলে?”

এরপর আমি ভারতের তৎকালীন ডিফেন্স অ্যাটাশে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নূর মোহাম্মদ নূর ইসলামকে জিজ্ঞেস করেছিলাম,

“আপনি কীভাবে এত নির্লজ্জের মতো সেই চিঠিতে স্বাক্ষর করলেন, যার মাধ্যমে ভারতীয় বাহিনীকে বাংলাদেশের সাতক্ষীরা সীমান্ত অতিক্রম করে অভিযান চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছিল?”

তিনি বিস্মিত হয়ে আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন,

“তুমি এসব জানলেন কীভাবে?”

আমি তাকে বলেছিলাম,

“আপনার অফিস থেকেই কেউ আমাকে সব নথিপত্র পাঠিয়েছে। আর এটি প্রমাণিত সত্য যে, ওই ‘টপ সিক্রেট’ চিঠিতে আপনারই স্বাক্ষর রয়েছে।”

আমি আরও বলেছিলাম,

“আল্লাহ চাইলে একদিন আপনাকেও আইনের মুখোমুখি হয়ে এই অমানবিক কর্মকাণ্ডের জবাব দিতে হবে।”

পরে ব্রিগেডিয়ার নূর আমার কাছে স্বীকার করেছিলেন যে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল তারেক আহমেদ সিদ্দিক তাকে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতির আশ্বাস দিয়ে প্রতারিত করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত সেই প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবায়িত হয়নি।”

পোস্টে আরো দাবি করা হয়, “তারা ভারতীয় বাহিনীকে বাংলাদেশ সীমান্ত অতিক্রম করে সন্ধ্যার পর অভিযান পরিচালনা এবং ভোর হওয়ার আগেই ভারতে ফিরে যেতে সহায়তা করেছিলেন। এ অভিযানে শত শত নিরীহ মানুষ নিহত হন। ”


এই একই ধরনের পোস্ট ছড়িয়ে পড়েছে এখানে, এখানে। এমনকি এটি নিয়ে প্রতিবেদন করেছে factlensbd.com

ফ্যাক্ট-চেক

কথিত ‘ভারতীয় অভিযানের অনুমতি দানের’ নথিটি ভুয়া এবং বানোয়াট।

ফ্যাক্ট-চেক জোনের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নথিতে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার’ এর যে সীল মারা হয়েছে, সেটি অসঙ্গতিপূর্ণ। সীলে ভুল বানান দেখা গেছে এবং কিছু কিছু জায়গায় বাংলা- হিন্দি-দেবনাগরী শব্দের মিশ্র প্রয়োগও দেখা গেছে৷ সরকারি কোন নথিতে এই ধরনের সীলের প্রয়োগ অবাস্তব। সাধারণত এ-আই দিয়ে বাংলা সীল জেনারেট করলে এই ধরনের অসঙ্গতি দেখা যায়৷ এছাড়াও একই নথিতে দুবার সীল ব্যবহার করা হলেও, দুটির মধ্যে অমিল লক্ষ করা গেছে।

সেই কথিত ‘গোপন নথি’

অসঙ্গতিপূর্ণ ভুয়া সীল

মূলত ২০১৩ সালে সর্বপ্রথম এই ‘কথিত গোপন নথি’ প্রথম প্রচার করে শিবির সমর্থিত পেজ ‘বাঁশের কেল্লা’, যা গুজব ছড়ানোর জন্য বহুল প্রচলিত। সেসময় এই অসমর্থিত  সূত্রকে গ্রহন করে কোন ধরনের যাচাই বাছাই ছাড়াই সংবাদ পরিবেশন করেছিল ‘ইনকিলাব’ পত্রিকা।  সরকারের পক্ষ থেকে তৎক্ষণাৎ বিবৃতি দিয়ে ‘কথিত নথি’ টিকে ‘ভুয়া’ বলে দাবি করা হয়। পরবর্তীতে ‘ইনকিলাব’ এই ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে এবং খবরটি সরিয়ে নেয়। এই ঘটনার ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও এই অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া নথিটির স্বপক্ষে কোন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এমনকি আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পরেও ‘ইনকিলাব’ এই ঘটনা নিয়ে তাদের ‘দুঃখ প্রকাশ’ এর অবস্থান থেকে সরে আসেনি কিংবা তথ্য প্রমাণ উপস্থাপন করে কোন ফলো-আপ প্রতিবেদন ছাপায়নি।

এছাড়াও মোস্তাফিজুর রহমানের পোস্টে সাতক্ষীরায় ‘শত শত নিহতের দাবি’ করা হলেও, বাস্তবে সাতক্ষীরায় ৫ জন নিহতের তথ্য পাওয়া যায়। তবে সে সময় জামাতের দাবি ছিল সংখ্যাটি ২ জন।

সীল ছাড়াও আছে নানা অসঙ্গতি

সীলের অসামঞ্জস্যতাকে এক পাশে সরিয়ে রাখলেও সামরিক এবং পররাস্ট্র নীতির বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কথিত নথিটিকে নির্ভরযোগ্য মনে না হওয়ার আরো একাধিক কারণ আছে। বাংলাদেশের সামরিক গবেষণাভিত্তিক পোর্টাল BDmilitary.com এর বিশ্লেষণে নিচের বিষয়গুলো উঠে এসেছে:

১. ফরেনসিক প্রমাণ ও মূল নথির অভাব
    • কোনো স্বাধীন পরীক্ষা হয়নি: এক দশকেরও বেশি সময় পার হলেও বিতর্কিত ওই নথির কোনো স্বাধীন ফরেনসিক পরীক্ষা বা যাচাইকরণ করা সম্ভব হয়নি।
    • মূল কপির অনুপস্থিতি: কথিত ওই গোপন দলিলের কোনো মূল ইলেকট্রনিক সংস্করণ বা অফিশিয়াল আর্কাইভ থেকে ভেরিফাইড (যাচাইকৃত) কোনো কপি জনসমক্ষে বা পাবলিক ডোমেইনে কখনোই আসেনি।
২. স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণের অনুপস্থিতি
    • কোনো দৃশ্যমান আলামত নেই: ভারতের ৩৩ কোরের মতো একটি বড় সামরিক ফরমেশন ব্যাটালিয়ন বা ব্রিগেড আকারে বাংলাদেশে প্রবেশ করলে তার কোনো না কোনো প্রমাণ অবশ্যই থাকত। এত বড় কোরের এই ধরনের অভিযানের উদ্দেশ্যে প্রবেশর সময় অবশ্যই লজিস্টিক আলামত থাকার কথা। গত ১২ বছরেও এই কথিত অভিযানের সপক্ষে কোনো স্যাটেলাইট ইমেজ, সামরিক লজিস্টিক রেকর্ড, অপারেশনাল ডায়েরি, কোনো ছবি কিংবা নির্ভরযোগ্য প্রত্যক্ষদর্শীর কোনো বিবরণ বা আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা রিপোর্ট পাওয়া যায়নি।
৩. সংবেদনশীল তথ্য চালানের নিয়মবহির্ভূত হওয়া
    • নথির অস্বাভাবিক শিরোনাম: নথিটির শিরোনাম ছিল “Military Aid from India and Deployment at Satkhira”। দুটি সার্বভৌম দেশের মধ্যে এত সংবেদনশীল সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে সাধারণত এত সরাসরি বা সাধারণ ভাষায় চিঠি আদান-প্রদান করা হয় না।
    • ভুল চ্যানেল ব্যবহার: এই ধরণের অত্যন্ত ক্লাসিফাইড সামরিক বা বৈদেশিক সহায়তার পরিকল্পনা কূটনৈতিক সাধারণ চিঠির মাধ্যমে হওয়ার কথা নয়। এগুলো মূলত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় (PMO), সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ (AFD) বা ডিজিএফআই (DGFI)-এর মতো উচ্চপর্যায়ের অতি-গোপনীয় চ্যানেলে সম্পন্ন হয়ে থাকে, যা এই নথির ক্ষেত্রে মেলেনি।
    • কূটনৈতিক চিঠিতে অপারেশনাল প্ল্যান: কূটনৈতিক চিঠির ভেতরেই অনুপ্রবেশের রুট বা সুনির্দিষ্ট অপারেশনাল এলাকার মতো গোপন সামরিক তথ্য জুড়ে দেওয়া অত্যন্ত অস্বাভাবিক, কারণ সামরিক পরিকল্পনাগুলো সবসময় আলাদা ও সুরক্ষিতভাবে বন্টন করা হয়।
৪. সোর্স বা উৎসের দুর্বলতা
    • সোশ্যাল মিডিয়া নির্ভরতা: পরবর্তীতে অনুসন্ধানে দেখা যায়, যে পত্রিকার রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে এই শোরগোল তৈরি হয়েছিল, তাদের প্রতিবেদনটি কোনো স্বাধীন বা নির্ভরযোগ্য অফিশিয়াল সোর্স থেকে নয়, বরং মূলত সোশ্যাল মিডিয়ায় আগে থেকে ঘুরতে থাকা কিছু দাবি ও পোস্টের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল।
প্রসঙ্গত মোস্তাফিজুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন জাতীয় ও রাজনৈতিক বিষয়ে মিস-ইনফরমেশন ও ডিসইনফরমেশন ছড়িয়ে আসছিলেন। একই অভিযোগে মেটা কর্তৃপক্ষ তার ফেসবুক একাউন্ট বন্ধ করে দেয়। বিতর্কিত এই সেনা কর্মকর্তার পেনশন ও অবসরজনিত সব আর্থিক সুবিধা সম্পূর্ণভাবে স্থগিত করেছে সরকার। লিংক