ফ্যাক্ট চেকস
প্রেমিক এবং সহপাঠীদের দ্বারা ধর্ষণকে ট্রাইব্যুনালে ‘আওয়ামী লীগ নেতা দ্বারা ধর্ষণের গল্প’ হিসেবে উপস্থাপন! “বাকশালের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড ছিলেন শেখ মনি”- শফিকুলের এই দাবি মিথ্যা ‘ঢাকেশ্বরী মন্দিরের জমি আওয়ামী লীগ দখল করেছে’; স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন দাবি সত্য নয়! ৬ মাসের মধ্যেই মালয়েশিয়াতে যাবে ২ লাখ জানালেন প্রতিমন্ত্রী, মালয়েশিয়ার প্রত্যাখান! মাথাবিহীন নারীর লাশ: বিদেশী ওয়েবসাইট থেকে সংগৃহীত ছবিকে নাটোর আওয়ামী লীগের নেত্রীর হত্যাকান্ড দাবিতে গুজব প্রচার! আদানির বিদ্যুৎ নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিল যুগান্তর “আমেরিকায় ১ মিনিট লোডশেডিং হলে লক্ষ লক্ষ ধর্ষণ হবে”–শিবির নেতা ফরহাদের দাবিটি ভিত্তিহীন
প্রেমিক এবং সহপাঠীদের দ্বারা ধর্ষণকে ট্রাইব্যুনালে ‘আওয়ামী লীগ নেতা দ্বারা ধর্ষণের গল্প’ হিসেবে উপস্থাপন!
আলোচিত ফ্যাক্টচেক

প্রেমিক এবং সহপাঠীদের দ্বারা ধর্ষণকে ট্রাইব্যুনালে ‘আওয়ামী লীগ নেতা দ্বারা ধর্ষণের গল্প’ হিসেবে উপস্থাপন!

জুলাইয়ে নিহত জসিমের স্ত্রী গত ৭ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ সাক্ষ্য দিতে গিয়ে জানান, জুলাইতে সাক্ষ্য দেয়ার অপরাধে তার বড় মেয়ে লামিয়াকে আওয়ামী লীগ নেতারা ধর্ষণ করেছে।

ওই নারী ট্রাইব্যুনালকে জানান, স্বামীর হত্যার বিষয়ে তদন্তকারীদের কাছে জবানবন্দি দিতে গত বছরের ১৭ মার্চ তিনি তার ভাই ও ছোট দুই সন্তানকে নিয়ে ঢাকায় আসেন। সে সময় তার এইচএসসি পরীক্ষার্থী বড় মেয়ে পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলার গ্রামের বাড়িতে রেখে আসেন তিনি। পরদিন ১৮ মার্চ তার মেয়ে বাবার কবর জিয়ারত করতে যায়। কিন্তু কবর জিয়ারত শেষে বাড়ি ফেরার পথে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা তাকে পথিমধ্যে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করে। কান্নায় ভেঙে পড়ে ট্রাইব্যুনালে তিনি বলেন, “আমি সাক্ষ্য দিতে ঢাকায় এসেছিলাম, আর এ কারণে তারা আমার মেয়েকে ধর্ষণ করেছে।”
তিনি আরো জানান, ধর্ষণের এই খবরটি এলাকায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে । এই চরম সামাজিক অপমান ও গুরুতর মানসিক আঘাত সহ্য করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় ওই কিশোরী। ৭ই সেপ্টেম্বর জসিমের স্ত্রীর সাক্ষ্য দেখুন এখানে, এখানে, এখানে 
যমুনা টিভিতে প্রকাশিত সংবাদ

 

নিহত জসিমের স্ত্রী রুমার বয়ানে একাধিক বিভ্রান্তিকর এবং অসংলগ্ন তথ্য খুঁজে পেয়েছে ফ্যাক্ট-চেক জোন।

ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে দেখা যায়, গত ২০২৫ সালের ১৮ মার্চ পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলার পাঙ্গাসিয়া ইউনিয়নের পশ্চিম আলগী গ্রামে জুলাই আন্দোলনে নিহত হওয়া পিতার কবর জিয়ারত করে বাড়ি ফেরার পথে ধর্ষণের শিকার হন লামিয়া। সেসময় দুমকি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাকির হোসেন জানান, ” কবর জিয়ারত করে তিনি নলদোয়ানী এলাকায় পৌঁছালে স্থানীয় সাকিব মুন্সি ও সিফাত মুন্সি তার মুখ চেপে ধরে পাশের জলিল মুন্সির পরিত্যক্ত বাগানে নিয়ে ধর্ষণ করে।’

অভিযুক্তরা ধর্ষণের ছবি মোবাইলে ভিডিও করে ও ছবি তুলে রাখে। ‘তারা হুমকি দেয়, এ ঘটনা প্রকাশ করলে বা আইনের আশ্রয় নিলে ধর্ষণের ছবি-ভিডিও ভাইরাল করে দেবে। এরপর ভুক্তভোগী তাঁর মা ও পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করে ২০ মার্চ দুপুরে থানায় গিয়ে অভিযোগ করেন। । তাৎক্ষণিক অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত সাকিব মুন্সিকে আটক করা হয়।  এর কিছুদিন পর সিফাত মুন্সিও আটক হয়। উল্লেখ্য আসামীদের একজনের বয়স ১৫ বছর এবং অন্যজনের বয়স ১৭ বছর। মামলা দায়েরের সময় থেকে শুরু করে পুলিশের বয়ানে শুরুতে কোথাও এই দুই কিশোরের আওয়ামী সংশ্লিস্টতার কোন তথ্য ছিলনা।

ডিএনএ টেস্টে নতুন মোড়

পরবর্তীতে ডিএনএ টেস্টে এই দুইজনের ধর্ষণের সত্যতা মেলে। তবে ধর্ষণস্থল থেকে আলামত হিসেবে সংগ্রহ করা গাছের শুকনা পাতা ফরেনসিক পরীক্ষার ফলাফল পাওয়ার পর মামলা চাঞ্চল্যকর মোড় নেয়।  প্রথমবারের মত  তৃতীয় একজনের আলামত শনাক্ত হয়। ডিএনএ টেস্টের পর মামলায় ৩য়  কিশোর ইমরান মুন্সীর নাম উঠে আসে এবং যথারীতি ইমরানের জড়িত থাকার সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়। এরপরই উঠে আসে লামিয়ার সাথে ইমরানের ঘনিষ্ঠতা থাকার চাঞ্চল্যকর তথ্য।

প্রেম থেকে নির্মম ট্র্যাজেডি

নানা সাক্ষ্য প্রমাণ থেকে জানা যায়, ঘটনার দিন (১৮ মার্চ,২০২৫)  সন্ধ্যা পৌনে ছয়টার দিকে বাবার কবর জিয়ারত করে নানা বাড়িতে ফিরছিল ভুক্তভোগী। পথে ভুক্তভোগীর কলেজের ঘনিষ্ঠ সহপাঠী ইমরানের সঙ্গে দেখা হয়। তখন ইমরান ভুক্তভোগীকে ফুসলিয়ে পাশের একটি বাগানে নিয়ে ধর্ষণ করে। এ সময় ভুক্তভোগীর চিৎকারে এজাহারভুক্ত দুই কিশোর ঘটনাস্থলে পৌঁছ ধর্ষণের দৃশ্য দেখে ফেলে এবং তা ফাঁস করে দেওয়ার ভয়ভীতি দেখায় ভুক্তভোগীর সহপাঠীকে। তখন এজাহারভুক্ত দুই কিশোরের মুখ বন্ধ রাখতে ভুক্তভোগীকে ধর্ষণ করতে সহায়তা করে ওই ইমরান। ভুক্তভোগীকে বিবস্ত্র করে ভিডিও মুঠোফোনে ধারণ করে দুই কিশোর। ভিডিও ফাঁসের হুমকি দিয়ে ভুক্তভোগীর মুখ বন্ধ রাখতে বলা হয়। বিস্তারিত

এ বিষয়ে ভুক্তভোগীর পরিবার  ইমরানকে মামলায় অভিযুক্ত করতে চাইলেও প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান ইমরানের জড়িত থাকার বিষয়টি শুরুতে রহস্যজনক পুলিশ এড়িয়ে যায়৷ এই সুযোগে ইমরান স্বপরিবারে বাড়িতে তালা দিয়ে পালিয়ে যায়৷ পরবর্তীতে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

ভুক্তভোগীর আত্মহত্যা 

এদিকে মামলা চলাকালীন ২৬ এপ্রিল ঢাকায় আত্মহত্যা করে লামিয়া। ধারণা করা হয় মামলার আসামী সাকিব জামিন পাওয়ায় লামিয়া ভীত এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে আত্মহত্যা করে।

মামলার বিচারকাজ এবং রায়

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ও পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে এই ঘটনার বিচারকাজ শুরু হয়। মামলার ৬ মাস ধরে শুনানি ও ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আদালত তিন আসামিকে গত ২২ অক্টোবর বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(৩) ধারায় প্রত্যেককে ১০ বছর করে এবং পর্নোগ্রাফি আইনের ৮(২) ধারায় দুই আসামিকে অতিরিক্ত ৩ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। দেখুন

এসময় আদালত প্রাঙ্গণে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও জেলা জজ আদালতের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মজিবুর রহমান টোটন বলেন, এই মামলার রায় সমাজের জন্য একটি বার্তা— কেউ অপরাধ করলে তাকে শাস্তি পেতেই হবে, সে যত প্রভাবশালীই হোক না কেন। দেখুন

উল্লেখ্য এই সুদীর্ঘ মামলা প্রক্রিয়ার কোথাও সাক্ষ্য দেয়ার অপরাধে আওয়ামী লীগ নেতা দ্বারা ধর্ষণ বা কিশোর আসামীদের আওয়ামী সংশ্লিষ্টতার কেন তথ্য পাওয়া যায় না। তবে আসামী সাকিব মুন্সীর পিতা মৃত মামুন মুন্সী বিএনপির নেতা ছিল বলে জানা যায়৷ 

তাহলে এখন কেন আওয়ামী লীগের নাম?

প্রেমিক এবং সহপাঠী দ্বারা নির্মমভাবে ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন কিশোরী লামিয়া। সকল তথ্য প্রমাণ দ্বারা এটি ইতিমধ্যেই প্রমাণিত এবং আদালতের রায় দ্বারা এটি ইতিমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত। তবে রায়ের দশ মাস পর রহস্যজনকভাবে এই সমস্ত বিচারিক তথ্য চেপে রেখে, ট্রাইব্যুনাল-১ এ অন্য মামলার সাক্ষী হয়ে ভিন্ন বয়ান দিয়েছেন জসিমের স্ত্রী। তিনি মেয়ের ধর্ষণ এবং পরবর্তীকালে আত্মহত্যার বিষয়টিকে আদালতে দাঁড়িয়ে ‘আওয়ামী লীগ নেতাদের কাজ’ বলে সাক্ষ্য দিচ্ছেন। আদালতে দাঁড়িয়ে তিনি আওড়াচ্ছেন, “আমি সাক্ষ্য দিতে ঢাকায় এসেছিলাম, আর এ কারণে তারা আমার মেয়েকে ধর্ষণ করেছে।”

রুমাকে কারা এভাবে বিভ্রান্তিকর সাক্ষ্য দিতে আদালতে দাঁড় করাচ্ছেন? মামলার স্বাভাবিক বিচার কার্যে কারা এভাবে নানা ‘রং’ লাগাতে চাইছেন? রাস্ট্রপক্ষ নাকি অন্য কেউ?