ফ্যাক্ট চেকস
প্রেমিক এবং সহপাঠীদের দ্বারা ধর্ষণকে ট্রাইব্যুনালে ‘আওয়ামী লীগ নেতা দ্বারা ধর্ষণের গল্প’ হিসেবে উপস্থাপন! “বাকশালের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড ছিলেন শেখ মনি”- শফিকুলের এই দাবি মিথ্যা ‘ঢাকেশ্বরী মন্দিরের জমি আওয়ামী লীগ দখল করেছে’; স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন দাবি সত্য নয়! ৬ মাসের মধ্যেই মালয়েশিয়াতে যাবে ২ লাখ জানালেন প্রতিমন্ত্রী, মালয়েশিয়ার প্রত্যাখান! মাথাবিহীন নারীর লাশ: বিদেশী ওয়েবসাইট থেকে সংগৃহীত ছবিকে নাটোর আওয়ামী লীগের নেত্রীর হত্যাকান্ড দাবিতে গুজব প্রচার! আদানির বিদ্যুৎ নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিল যুগান্তর “আমেরিকায় ১ মিনিট লোডশেডিং হলে লক্ষ লক্ষ ধর্ষণ হবে”–শিবির নেতা ফরহাদের দাবিটি ভিত্তিহীন
‘ঢাকেশ্বরী মন্দিরের জমি আওয়ামী লীগ দখল করেছে’; স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন দাবি সত্য নয়!
বিভ্রান্তিকর

‘ঢাকেশ্বরী মন্দিরের জমি আওয়ামী লীগ দখল করেছে’; স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন দাবি সত্য নয়!

দাবি,

দাবি করা হয়েছে: “ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের জমি আওয়ামী লীগ দখল করে রেখেছে / আওয়ামী লীগই ঢাকেশ্বরী মন্দিরের জমি দখল করেছে।”

দাবির উৎস ও প্রেক্ষাপট

 

 

উৎস: সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ( এখানে ইউটিউব লিংক) এবং কিছু সংবাদমাধ্যমে (লিংক এখানে )  স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বা রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের বক্তব্যকে উদ্ধৃত করে এই দাবি প্রচার করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন ইউটিউব চ্যানেল ( ফেসবুকে ভিডিও লিঙ্ক) ও অনলাইন পোর্টালে দাবি করা হয় যে ঢাকেশ্বরী মন্দিরের ঐতিহাসিক বেদখল হওয়া জমির জন্য এককভাবে আওয়ামী লীগ সরকার ও দল দায়ী।

প্রেক্ষাপট: ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিভিন্ন উৎসব (যেমন জন্মাষ্টমী ও আসন্ন দুর্গোৎসব) উপলক্ষে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির পরিদর্শনে যান। সেখানে মন্দিরের বেদখল হওয়া সম্পত্তি পুনরুদ্ধার সংক্রান্ত আলোচনার প্রেক্ষাপটে এ ধরনের দাবি ব্যাপকভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

ফ্যাক্ট-চেক

ক. দাবিটির সমর্থনে প্রমাণ ও উপাদান

দীর্ঘ ১৫ বছরের বেশি সময় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে ঢাকেশ্বরী মন্দিরের সম্পূর্ণ বেদখল হওয়া সম্পত্তি পুরোপুরি উদ্ধার হয়নি।

দেশের বিভিন্ন স্থানে অর্পিত সম্পত্তি ও দেবোত্তর সম্পত্তি স্থানীয়ভাবে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দখলে থাকার নজির রয়েছে, যার মধ্যে বিভিন্ন সময় ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাকর্মীরাও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন বলে বিভিন্ন অধিকার রক্ষা সংস্থা ও ধর্মীয় পরিষদের বিভিন্ন প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে।

খ. দাবিটির বিপরীতে তথ্য ও ঐতিহাসিক সত্যতা

বেদখলের ঐতিহাসিক পটভূমি: ঢাকেশ্বরী মন্দিরের মূল জমি ছিল প্রায় ২০ বিঘা। তবে জমি বেদখলের প্রক্রিয়াটি কোনো একক রাজনৈতিক দলের আমলে শুরু হয়নি। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ, ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর জারি হওয়া বিতর্কিত ‘শত্রু সম্পত্তি আইন’ (পরবর্তীতে ‘অর্পিত সম্পত্তি আইন’) এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ও পরবর্তী বিভিন্ন সামরিক ও বেসামরিক সরকারের (পাকিস্তান আমল, ১৯৭৫-পরবর্তী জিয়াউর রহমান, এরশাদ ও বিএনপি সরকার) আমলে ধীরে ধীরে মন্দিরের আশপাশের জমি ব্যক্তি ও বিভিন্ন সংস্থার দখলে চলে যায়।

২০১৮ সালের জমি হস্তান্তর: বাস্তব তথ্যানুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই প্রায় ৬০ বছর ধরে বিরোধপূর্ণ অবস্থায় থাকা ঢাকেশ্বরী মন্দিরের ভেতরের ও সংলগ্ন ১.৫ বিঘা (প্রায় ৫০ কাঠা) জমি উদ্ধার করে ২০১৮ সালের অক্টোবরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে মন্দির কমিটির (মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটি ও বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ) কাছে হস্তান্তর করেন। এই জমি বাবদ ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনে সরকারি তহবিল থেকে প্রায় ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।

বর্তমান অবস্থা: মন্দিরের মূল ২০ বিঘার মধ্যে বর্তমানে কেন্দ্রীয় চত্বর ও হস্তান্তরকৃত অংশ মিলিয়ে প্রায় ৫-৬ বিঘা জমি মন্দিরের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বাকি প্রায় ১৪ বিঘা জমি এখনো ব্যক্তি মালিকানা ও বিভিন্ন মামলার জটিলতায় আটকে রয়েছে, যা গত ৫০-৬০ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন পক্ষের দখলে রয়েছে; এটি এককভাবে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের দখলকৃত নয়।

সংশ্লিষ্ট তথ্যসূত্র:

আর টিভি  (২২ অক্টোবর ২০১৮) – “ঢাকেশ্বরী মন্দিরের দেড় বিঘা জমি হস্তান্তর করলেন প্রধানমন্ত্রী

দ্য ডেইলি স্টার (১৬ অক্টোবর ২০১৮) – “PM hands over land to Dhakeshwari Temple

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ ও মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটি-র ঐতিহাসিক নথি ও প্রকাশনা।

ঢাকা জেলা প্রশাসন ও ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর (অর্পিত সম্পত্তি ও দেবোত্তর সম্পত্তি রেকর্ডস)

IFCN নীতিমালার আলোকে মূল্যায়ন

দলনিরপেক্ষতা ও ন্যায্যতা

কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর পক্ষাবলম্বন না করে নিরপেক্ষভাবে ঐতিহাসিক জমির রেকর্ড, সরকারি সিদ্ধান্ত এবং গেজেট পর্যালোচনা করা হয়েছে।

আওয়ামী লীগের আমলে জমি উদ্ধারের তথ্য যেমন তুলে ধরা হয়েছে, তেমনি দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থেকেও বাকি জমি উদ্ধার না হওয়ার বাস্তবতাও নিরপেক্ষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তথ্যের উৎসের স্বচ্ছতা

ঐতিহাসিক দলিল, জাতীয় গণমাধ্যমের পূর্ববর্তী আর্কাইভাল রিপোর্ট, পূজা কমিটির প্রেস বিজ্ঞপ্তি এবং ভূমি প্রশাসনের নথিকে প্রাথমিক ও নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে যাচাই করা হয়েছে।

কোনো বেনামী সূত্রের ওপর নির্ভর না করে যাচাইযোগ্য উন্মুক্ত তথ্যসূত্র ব্যবহার করা হয়েছে।

পদ্ধতিগত স্বচ্ছতা

দাবির সত্যতা যাচাইয়ে কি-ওয়ার্ড সার্চ (‘Dhakeshwari temple land acquisition’, ‘ঢাকেশ্বরী মন্দির জমি উদ্ধার ২০১৮’, ‘দেবোত্তর সম্পত্তি বিরোধ’) ব্যবহার করে বিগত কয়েক দশকের সংবাদ, গবেষণা ও প্রশাসনিক তথ্য যাচাই করা হয়েছে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের সাথে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বক্তব্য মিলিয়ে দেখে দাবির তথ্যগত ফারাক চিহ্নিত করা হয়েছে।

ফ্যাক্ট চেক রায়

🟡 PARTLY TRUE / MISLEADING (আংশিক সত্য / বিভ্রান্তিকর)

(দাবিটি বিভ্রান্তিকর। ঢাকেশ্বরী মন্দিরের জমি বেদখল থাকার বিষয়টি সত্য হলেও, এটি এককভাবে আওয়ামী লীগ দখল করেছে—এমন দাবি ঐতিহাসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক তথ্যের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ।)

ব্যাখ্যা

ঢাকেশ্বরী মন্দিরের প্রায় ১৪ বিঘা জমি গত পাঁচ-ছয় দশক ধরে (পাকিস্তান আমল ও শত্রু সম্পত্তি আইনের সময়কাল থেকে) বেদখল ও বিরোধপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে, যা একাধিক সরকারের আমল জুড়ে বিস্তৃত। ঐতিহাসিকভাবে একক কোনো রাজনৈতিক দল এই জমি দখল করেনি; বরং ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েই প্রায় ৬০ বছর বেদখলে থাকা ১.৫ বিঘা জমি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্ধার করে মন্দির কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল। ফলে দীর্ঘদিনের সামগ্রিক জমি বেদখলের জন্য এককভাবে কেবল একটি দলকে দায়ী করে প্রচার করা দাবিটি তথ্যগতভাবে অসম্পূর্ণ এবং বিভ্রান্তিকর।

নির্দেশনা

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট যাচাই: দেবোত্তর সম্পত্তি বা শতবর্ষী ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের জমি সংক্রান্ত দাবির ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক মন্তব্যের ওপর নির্ভর না করে সিএস, এসএ, আরএস রেকর্ড এবং অর্পিত সম্পত্তি আইনের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা পরীক্ষা করা বাঞ্ছনীয়।

সরকারি গেজেট ও হস্তান্তর দলিল নিরীক্ষা: কোনো স্থাপনা বা ভূমি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত যাচাই করতে ভূমি মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক দলিল বা নির্ভরযোগ্য জাতীয় মহাফেজখানার রেকর্ড ক্রস-চেক করা প্রয়োজন।