ফ্যাক্ট চেকস
‘পশ্চিমবঙ্গে মসজিদ থেকে খুলে নেয়া হচ্ছে মাইক!’-অর্ধসত্য খবর দিল চ্যানেল ২৪, আমার দেশ সহ একাধিক মিডিয়া জুলাই আন্দোলনে পুলিশ কি স্নাইপার রাইফেল ব্যবহার করেছিল? ৭.৬২’র প্রকৃত সত্য কি? ‘ভুয়া’ নথি দিয়ে সাতক্ষীরায় ভারতীয় সেনা অভিযানের ‘কাল্পনিক’ গল্প প্রচার! চট্টগ্রামের হাসপাতালের মোবাইল চোরকে নড়াইলের ছাত্রলীগ নেতা বলে প্রচার! ফাইনালে মেসির পরিবার অনুপস্থিত থাকার দাবিটি সত্য নয়! কথিত ‘মুক্তিযোদ্ধা’ জামাত এমপি গাজী নজরুলের নেই মুক্তিযোদ্ধা সনদ, সংসদে দাঁড়িয়ে করেন বিকৃত ইতিহাস প্রচার! আসামের শিক্ষক প্রশিক্ষণের ভিডিওকে বাংলাদেশের দাবি করে গুজব ছড়ালেন ‘আমার দেশ’ এর স্টাফ রিপোর্টার
জুলাই আন্দোলনে পুলিশ কি স্নাইপার রাইফেল ব্যবহার করেছিল? ৭.৬২’র প্রকৃত সত্য কি?
বিভ্রান্তিকর

জুলাই আন্দোলনে পুলিশ কি স্নাইপার রাইফেল ব্যবহার করেছিল? ৭.৬২’র প্রকৃত সত্য কি?

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে জাতীয় নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের চিকিৎসক জানান, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ১৬৭ জন জনের অধিকাংশেরই খুলিতে আঘাত ছিল।

প্রকাশিত আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, নিহতদের প্রায় ৪৭ শতাংশের বুকে এবং ২৯ শতাংশের মাথায় গুলি লেগেছিল।

এছাড়া জুলাই আন্দোলনের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদমাধ্যম এবং মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে বহু ব্যক্তির মাথা, ঘাড় ও চোখে গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা উঠে এসেছে। অনেকেই স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন।

এসব তথ্য থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—মাথা ও চোখে গুরুতর আঘাতের ঘটনা বিচ্ছিন্ন ছিল না। বরং এটিই ছিল টারগেটেড প্যাটার্ন।

জুলাইয়ের আন্দোলনের ধরণ ছিল সহিংস। আন্দোলনকারীরা পুলিশের উপর হামলা, বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা এবং অগ্নিসংযোগ করেছে। পুলিশ এবং হাজার হাজার আন্দোলনকারীরা প্রতিনিয়ত ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার উপরেই ছিল। এসময় আমরা দেখেছি আন্দোলনকারীরা যেমন বৃষ্টির মত পুলিশের দিকে পাথর ছুড়ে মেরেছিলো, পুলিশও ধাওয়া দিতে দিতে গুলি ছুড়েছে, সেটা কখনো রাবার বুলেট আবার কখনো প্রাণঘাতি বুলেট৷  ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার মধ্যে পুলিশের গুলি ছোড়ার ধরনই ছিল এলোপাথাড়ি। এসবের মধ্যেই বুলেট নিখুতভাবে কিভাবে খুলিতে গিয়ে আঘাত করে?বাংলাদেশের পুলিশরা এতটাও সুদক্ষ শুট্যার নন যে তারা রাস্তায় ছোটাছুটির মধ্যেই নিখুঁতভাবে গতিশীল কোন টার্গেটে লক্ষ্য ভেদ করবেন।প্রশ্ন হচ্ছে – তাহলে এত বুলেট কিভাবে নিখুঁতভাবে খুলি বা গলায় গিয়ে আঘাত করলো? 

এক্ষেত্রে দুটি স্যাম্পল হতে পারে বহুল আলোচিত মুগ্ধ এবং হৃদয় তরুয়া। দুইজনের ক্ষেত্রেই তাদের পাশে থাকা প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, এরা গুলিবদ্ধ হওয়ার সময় কাছাকাছি কোন বাহিনী কিংবা আওয়ামী লীগের কর্মীকে তারা দেখেননি। হঠাতই অজ্ঞাত কোন স্থান থেকে আসা বুলেট এদের মাথা কিংবা গলায় আঘাত করেছিল। এইভাবে মাথায় এক্যুরেটলি গুলি ছুড়তে পারে স্নাইপাররা, যারা সুউচ্চ কোন জায়গা থেকে বসে ঠান্ডা মাথায় এই কাজ করেছে।

আন্দোলনে স্নাইপারের ব্যবহার সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের দুই উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শাখাওয়াত এবং প্রফেসর আসিফ নজরুল। তারা দুজনেই জানিয়েছেন আন্দোলনের সময় তাদেরকে স্নাইপার টার্গেটে রাখা হয়েছিল এবং এই বিষয়ে সতর্ক করতে তাদের কাছ উড়ো ফোনকল এসেছিল। একই ধরনের তথ্য দিয়েছেন চীফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। গত ৬ জুলাই তিনি জানান, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানে স্নাইপার রাইফেল ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে“। এই স্নাইপার কারা? পুলিশ? অন্য কোন বাহিনী? নাকি বহিরাগত?

  1. এই রহস্যগুলো থেকেই প্রাসংগিকভাবে ৭.৬২ নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা বিভ্রান্তি এবং পাল্টা দাবি। এক পক্ষের দাবি বাংলাদেশ পুলিশের কাছে ৭.৬২ mm অস্ত্রই ছিল না, তাই এই গুলি অন্য কোনো পক্ষ চালিয়েছে। অন্যদিকে আরেকপক্ষ দাবি করে, পুলিশের কাছে ৭.৬২ mm স্নাইপার রাইফেল ছিল এবং সেগুলো দিয়েই গুলি চালানো হয়েছে।উভয় দাবিতেই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আংশিকভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। কিন্তু এই বিভ্রান্তি নিরসনে সরকার বা তদন্ত সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে কার্যকর কোন পদক্ষেপ, তদন্ত এমনকি পরিষ্কার কোন বিবৃতিও দেখা যায়নি। নানা তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ এবং অনুসন্ধান করে ফ্যাক্ট-চেক জোন এই বিভ্রান্তির জট খোলার চেষ্টা করেছে।

“পুলিশের কাছে ৭.৬২mm অস্ত্র ছিল না”?

সরকারি ক্রয় নথি, পুলিশ সদর দপ্তরের টেন্ডার এবং একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশ পুলিশ বহু বছর ধরেই ৭.৬২mm ক্যালিবারের বিভিন্ন অস্ত্র ব্যবহার করে আসছে। এর মধ্যে চীনা ৭.৬২mm রাইফেলও রয়েছে।

২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে ১৫ হাজার পিস ৭.৬২ সেমি-অটোমেটিক রাইফেল ক্রয়ের এরকমই একটি দরপত্র আহ্বান করেছিল সরকার।

২০১৯ সালে ১৫,০০০ পিস ৭.৬২ রাইফেলের দরপত্র

 

ছবি- 7.62mm Type 56 semi automatic chinese rifles
নমুনার উৎস- Modern Firearms

কেবল পুলিশই নয়। বিজিবি এবং সেনাবাহিনীও এই ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করে থাকে। আন্দোলনের সময় বিভিন্ন ভিডিও ও আলোকচিত্রেও পুলিশের সদস্যদের এসব অস্ত্র বহন করতে দেখা গেছে। ২০২৪ সালের ৩ রা আগস্ট The Daily Star এর প্রতিবেদনে প্রকাশিত একাধিক ধারণকৃত ছবিতে  বিভিন্ন বাহিনীকে আন্দোলন দমন এবং আত্মরক্ষায় রাবার বুলেটের পাশাপাশি এই ৭.৬২ ব্যবহার করতে দেখা যায়।

 

ছবি-ডেইলি স্টারে প্রকাশিত ৭.৬২ সেমি অটোমেটিক চাইনিজ রাইফেল হাতে পুলিশ 

 

তাহলে পুলিশই কি স্নাইপার চালিয়েছে?

না। অন্তত এখন অব্দি পাওয়া তথ্য প্রমানের ভিত্তিতে এই কথা বলার কোন সুযোগ নেই পুলিশই স্নাইপার চালিয়েছে।  কিন্তু একটু আগেই যে বলা হলো পুলিশ ৭.৬২ চালিয়েছে? খটকা লাগছে?

পুলিশের কাছে অবশ্যই ৭.৬২ ছিল। তবে সেটি ছিল চাইনিজ রাইফেল। পুলিশের কাছে কোন ৭.৬২ স্নাইপার ছিল না

জনমনে অনেকেরই বিভ্রান্তি আছে ৭.৬২ মানেই স্নাইপার। বিষয়টি মোটেও সত্য নয়।

সহজ ভাষায় বললে, ৭.৬২ মানেই বিশেষ কোন অস্ত্র নয়। বরং এটি গুলির আকার (ক্যালিবার) একজন মানুষের জুতার মাপ যেমন ৪২ হতে পারে এবং ওই একই সাইজে রানিং শু, বুট বা স্যান্ডেল—সবই হতে পারে; তেমনি ৭.৬২ ক্যালিবারের গুলি বিভিন্ন ধরনের অস্ত্রে ব্যবহার করা যায়।বাংলাদেশ পুলিশের কাছে যে ৭.৬২ মিমি চীনা রাইফেল ছিল, তা মূলত একটি ব্যাটল রাইফেল। এর উদ্দেশ্য হলো সাধারণ যুদ্ধ বা নিরাপত্তা অভিযানে ব্যবহার করা হয়। এর কার্যকর দূরত্ব সাধারণত কয়েকশ মিটারের মধ্যে।অত্যন্ত সূক্ষ্ম লক্ষ্যভেদের জন্য এটি তৈরি নয়।

অন্যদিকে স্নাইপার রাইফেল সম্পূর্ণ ভিন্ন উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়। এর বৈশিষ্ট্য এটি দূর থেকে বা সুউচ্চ কোন ভবন থেকে একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে গুলি করার জন্য ডিজাইন করা। এতে শক্তিশালী টেলিস্কোপিক স্কোপ থাকে। ব্যারেল, ট্রিগার ও পুরো অস্ত্র এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে গুলি অত্যন্ত নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে লাগে।একজন প্রশিক্ষিত স্নাইপার সাধারণত একটি গুলি ছোড়ার আগে দীর্ঘ সময় ধরে লক্ষ্য স্থির করেন। এর রেঞ্জ ১ হাজার মিটার পর্যন্ত, যেখানে বাংলাদেশ পুলিশের কাছে থাকা রাইফেলের রেঞ্জ কয়েকশো মিটারের বেশি নয়। 

ছবি- 7.62mm Sniper Rifle

পুলিশের কাছে থাকা সেমি-অটোমেটিক রাইফেলে ব্যবহার করা হয় ৭.৬২×৩৯ মিমি কার্তুজ। অন্যদিকে, ড্রাগুনভের মতো স্নাইপার রাইফেলে ব্যবহার করা হয় ৭.৬২×৫৪আর মিমি কার্তুজ, যা পুলিশ ব্যবহার করেনা অর্থাৎ দুটিই ৭.৬২ মিমি হলেও এগুলো একই ধরনের কার্তুজ নয়

 

তফাতটা অনেকটা এরকম, ধরুন দুটি ক্যামেরা ৫০ মেগাপিক্সেলের।একটি মোবাইল ফোনের ক্যামেরা। আরেকটি পেশাদার DSLR। দুটির রেজোলিউশন কাছাকাছি হলেও ছবি তোলার ক্ষমতা এক নয়। ৭.৬২ রাইফেল ও ৭.৬২ স্নাইপার রাইফেলের পার্থক্যও অনেকটা এমন।

স্নাইপার নিয়ে পুলিশের বিবৃতি

ইতিমধ্যেই পুলিশ সদরদপ্তর জানিয়েছে ২০২৪ সালের ৫ই অগাস্টের আগে পুলিশের কোনো স্নাইপার রাইফেল ছিল না।

তবে গণমাধ্যমে প্রকাশিত ২০২৩ সালে ৩০ টিএবং ২০২৪ সালে ৫০টি  দুই দফায় পুলিশের প্যাডে ছাপানো স্নাইপার কেনার ক্রয়াদেশ বা দরপত্র ফ্যাক্ট-চেক জোনের হাতে এসেছে। পুলিশ সদর দফতর নিশ্চিত করেছে সেগুলো জাতিসংঘ মিশনের জন্য কেনা হয়েছে এবং এই স্নাইপার গুলো ২০২৪ এ নয়, বরং ২০২৫ সালে পুলিশের হাতে এসেছ। ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থাও পুলিশের কাছে স্নাইপার রাইফেলের ব্যবহারের কোনো তথ্য প্রমাণ পায়নি। এ সংক্রান্ত বিবিসির প্রতিবেদন দেখুন

চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন,”আমরা যেটুকু সন্দেহ করি যে স্নাইপারের ব্যবহার হয়েছে উত্তরায়, যাত্রাবাড়ীতে এবং অনেকগুলো জায়গায়। স্নাইপারের ব্যবহার নিয়ে ইনভেস্টিগেশন আমাদের চলমান আছে নিশ্চই আমরা সেই বিষয়ে একটা কনক্রিট একটা রিপোর্ট আমরা দিতে পারবো।”

যেখানে আন্দোলনে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ স্নাইপারের গুলিতে নিহত হওয়ার আলামত পাওয়া গেছে, সেখানে দীর্ঘ ২ বছরেও এ সংক্রান্ত বিস্তারিত কোন forensic/ballistic তদন্ত না হওয়া, ইউনুস সরকারের এ সংক্রান্ত নীরবতা এবং এ বিষয়ে মন্তব্য করায় শাখাওয়াতকে সরিয়ে দেয়া অবশ্যই নানা রহস্য এবং প্রশ্নের উদ্রেক তৈরি করে।

আন্দোলনে স্নাইপার সেজে কারা মানুষ হত্যা করেছিল, এই রহস্যের সমাধান হবে কি?