ফ্যাক্ট চেকস
ফাইনালে মেসির পরিবার অনুপস্থিত থাকার দাবিটি সত্য নয়! কথিত ‘মুক্তিযোদ্ধা’ জামাত এমপি গাজী নজরুলের নেই মুক্তিযোদ্ধা সনদ, সংসদে দাঁড়িয়ে করেন বিকৃত ইতিহাস প্রচার! আসামের শিক্ষক প্রশিক্ষণের ভিডিওকে বাংলাদেশের দাবি করে গুজব ছড়ালেন ‘আমার দেশ’ এর স্টাফ রিপোর্টার ‘বন্যায় ইউনুসের দশ হাজার কোটি টাকার সহায়তা’,-স্যাটায়ার পোস্টকে সত্য ভেবে শেয়ার দিচ্ছেন ইউনুসপন্থী এক্টিভিস্টরা! ফ্যাক্ট চেক: পরীক্ষার্থীদের ভোগান্তি নিয়ে সংসদে শিক্ষামন্ত্রীর দেয়া বক্তব্য সঠিক নয় “একাত্তরের পর প্রণীত দুইশো জন যুদ্ধাপরাধীর তালিকায় জামাত নেতাদের নাম নেই”-মারদিয়া মমতাজের দাবিটি মিথ্যা! ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ আজহারউদ্দীন পুত্র বীর বিক্রম মেজর হাফিজের ক্রমাগত ইতিহাস বিকৃতি!
তারেক রহমানের মিথ্যাচার: সরকারি হিসাবে ৮৪৮, বক্তব্যে ২ হাজার! জুলাই নিহতের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন
আলোচিত ফ্যাক্টচেক

তারেক রহমানের মিথ্যাচার: সরকারি হিসাবে ৮৪৮, বক্তব্যে ২ হাজার! জুলাই নিহতের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, “জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অন্তত ২ হাজার মানুষ প্রাণ দিয়েছেন। ৪ জুলাই দুপুরে রাজধানীর চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জুলাই আন্দোলনে নিহতদের স্মরণসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন” লিংক

তারেক রহমান ২ হাজার নিহতের দাবি করলেও, জুলাই আন্দোলনে নিহতের সংখ্যা নিয়ে একেক জায়গায় ভিন্ন ভিন্ন সময়ে একেক রকমের তথ্য উপস্থাপন করা হয়ে থাকে। সবচেয়ে প্রচলিত দাবি ১৪০০ থেকে ১৫০০।

সর্বপ্রথম ১৫০০ নিহতের দাবি

জুলাইতে সর্বপ্রথম ১৫০০ নিহতের দাবি করেন কলকাতার বামপন্থী সাংবাদিক অর্ক ভাদুরী। শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ঘন্টাখানেক পর ৫ আগস্ট দুপুর ৩টা ৮ মিনিটে ফেসবুকে তিনি এই দাবি করেন। পোস্ট লিংক

অর্ক ভাদুরীর পোস্ট

অর্ক ভাদুরীর পোস্টের পরেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের একটি বড় অংশ শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর বিক্ষুব্ধ হয়ে থানা আক্রমণ, অস্ত্র লুট, আওয়ামী সংশ্লিস্ট নেতাদের বাড়ি বা প্রতিষ্ঠানে অগ্নিকান্ড করতে গিয়ে নিহত হয়েছেন। এসব মৃত্যু ৫ আগস্ট দুপুরের পর থেকে ৮ আগস্ট ইউনুস সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত সংঘটিত হয়।  বাংলাদেশের বাইরে থেকে দুপুর ৩ টায় উল্লেখযোগ্য লোক নিহত হওয়ার আগেই কিভাবে অর্ক ভাদুরী ১৫০০ নিহতের দাবি করেছেন তা নিশ্চিত নয়। অর্ক ভাদুরী কি দুপুর ৩ টার পর থেকে শুরু করে পরবর্তী কয়েকদিন যারা নিহত হয়েছেন তাদের সংখ্যাটি অগ্রীম অনুমান করে ১৫০০ এর দাবি করেছিলেন? ধরে নেয়া যায় ৫ আগস্ট দুপুরেই তিনি একটি আনুমানিক সংখ্যা দাবি করেছিলেন। তবে সেই অনুমাননির্ভর সংখ্যার দাবির স্বপক্ষে তিনি সেই পোস্টে বা পরবর্তীতে কোন তথ্যসুত্র উপস্থাপন করেননি। তাই ভাদুরীর এই পোস্টের তথ্যকে নির্ভরযোগ্য ধরে নেয়া কঠিন।

ইন্টেরিম এবং OHCHR এর ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং রিপোর্টে ‘১৪০০’

পরবর্তীতে অবশ্য ইন্টেরিম সরকার এবং আন্দোলনের নেতাদের এই সংখ্যাটিকেই প্রচার করতে দেখা যায় এবং এই একই ধরনের তথ্য দেখা যায় OHCHR এর ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং রিপোর্টে। ভলকার তুর্কের তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত OHCHR Fact-Finding Report: Human Rights Violations and Abuses related to the Protests of July and August 2024 in Bangladesh  নামক প্রতিবেদনের ১০ম পৃষ্ঠায় ‘স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন সংস্থা থেকে সরবারহকৃত তথ্যের ভিত্তিতে’ আনুমানিক ১৪০০ মৃত্যুর ধারণা প্রকাশ করা হয়। তবে “কোথায়, কোন জায়গায়, কত তারিখে,কিভাবে”, এই ১৪০০ জন নিহত হয়েছেন এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন সংস্থা OHCHR কে এই দাবির স্বপক্ষে কোন ধরনের বিস্তারিত তালিকা বা তথ্য সরবরাহ করেছে তা উক্ত প্রতিবেদনে উপস্থাপন করা হয়নি।

julyshohid.com এর তালিকায় ৮০৭

julyshohid.com নামক একটি প্লাটফর্মকে জুলাইতে নিহতদের তালিকা নিয়ে কাজ করতে দেখা গেছে। এই তালিকায় পাওয়া গেছে ৮০৭ জনের নাম, যার মধ্যে আবার ওসমান হাদীর নামও পাওয়া যায়। তালিকা

 

সরকারি তালিকায় ৮৪৮, আছে শতাধিক অসঙ্গতিপূর্ণ নাম

জুলাই আন্দোলনে নিহতদের রাস্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়ে ইন্টেরিম আমলে সরকারিভাবে প্রকাশ করা হয়েছিল ‘জুলাই শহীদ তালিকা’। সেই তালিকায় প্রত্যেক নিহতদের নাম, ঠিকানা, বাবার নাম উল্লেখ করা আছে। জুলাইতে নিহতদের তথ্য নিয়ে এটিই এখন পর্যন্ত একমাত্র অফিসিয়াল এবং নির্ভরযোগ্য তালিকা। এখন পর্যন্ত মোট ৩ দফায় সরকারি গেজেট দিয়ে এই তালিকায় ৮৫৬ জনের নাম প্রকাশ করা হয়েছে। জুলাই শহীদ তালিকা

তবে শুরু থেকেই এই তালিকাতেও একাধিক অসঙ্গতি ধরা পড়ে।১৫ সেপ্টেম্বর ‘জমির বিরোধে খুন, দুর্ঘটনায় মৃত্যু, তবু তাঁরা জুলাই শহীদ’ শিরোনামে প্রথম আলোতে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এরকম ৫২ গেজেটপ্রাপ্ত ব্যক্তির নাম উঠে আসে যারা আসলে জুলাই আন্দোলন ঘটিত কারণে নিহত হননি। এরকম বিভিন্ন সময়ে নানা অনুসন্ধানে দেখা গেছে তালিকাভুক্ত শতাধিক ব্যক্তিই জুলাইঘটিত কারণে সরকারি বাহিনী কর্তৃক নিহত হননি। তালিকায় মদ খেয়ে বারে নিহত, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত, ধর্ষণ করতে গিয়ে গণপিটুনিতে নিহতজেল থেকে পালাতে গিয়ে নিহত জঙ্গি জিন্নাহ মিয়া (গেজেট ৩৭৫) সহ প্রচুর অসঙ্গতিপূর্ণ নাম দেখা গেছে।  এ বিষয়ে সরকার ইতিমধ্যেই ৮ জনের নাম বাদ দেয় এবং যাচাই বাছাই চলমান বলে জানায়। সরকারি হিসেবে এখন ‘জুলাই শহীদ’ তালিকা ৮৪৮ জনের। নানা অসঙ্গতিপূর্ণ বা ভুয়া নামগুলো বাদ পড়ার পর এই তালিকা ৮০০ এর নিচে নেমে আসবে।

এর বাইরে রায়েরবাজারে অজ্ঞাতনামা হিসেবে জুলাই মাসে বেশ কিছু লাশ দাফন করা হয়। আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের একজন কর্মকর্তা জানান, প্রতি মাসে তারা গড়ে ৩৫-৪০ জনের বেওয়ারিশ লাশ দাফন করেন। তবে জুলাই-আগস্ট এই ২ মাসে সংখ্যাটি ছিল গড়ে ৫৭ (মোট ১১৪), অর্থাৎ স্বাভাবিকের চেয়েও ২ মাসে ৪০-৪৫ জন বেশি। ধারণা করা হয় এই  বাড়তি সংখ্যার একটি অংশ জুলাইতে আন্দোলনে নিহত হয়েছেন যাদেরকে ডিএনএর মাধ্যমে শনাক্ত করার প্রচেস্টা চলছে। এদের মধ্যে ইতিমধ্যেই ৮ জনের লাশ শনাক্ত করা হয়েছে এবং কয়েকজনকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এদের বাইরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কোন সংখ্যা বাদ পড়েছে এরকম দাবি এখনো পর্যন্ত দেখা যায়নি। অর্থাৎ সরকারি হিসেবে এই তালিকা এখনো ৭৫০-৮৫০ এর ভেতরেই থাকছে।

তাহলে কিসের ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রীর দাবি ‘২হাজার’

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলছেন ‘তার হিসাবে’ অন্তত ২ হাজার মানুষ প্রাণ দিয়েছেন। কিন্তু সরকারি তালিকায় ৮৪৮ জন, যার মধ্যে আবার শতাধিক নামই অসঙ্গতিপূর্ণ। প্রশ্ন উঠে, প্রধানমন্ত্রীর ‘হিসাবে’র বাকি নামগুলো কোথায়? এদেরকে শনাক্ত করা হচ্ছে না কেন? এরা কি এই তথ্যপ্রযুক্তির যুগেও হিসাবের বাইরে থেকে যাবেন? নাকি প্রকৃত সংখ্যাকে অতিরঞ্জিত করে কখনো দেড় হাজার, কখনো দুই হাজারের তথ্য দেয়া হচ্ছে?

৫ আগস্টে শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর জেনারেল ওয়াকার যখন সমস্ত দায়িত্ব ‘নিজ কাঁধে’ তুলে নিয়েছেন, সেসময়ে ‘বিক্ষুব্ধ জনতা’ দ্বারা থানা আক্রমণ, অস্ত্র লুট, অগ্নিকান্ড করতে গিয়ে যে কয়েকশো মানুষ নিহত হয়েছেন, তাদের স্ট্যাটাসই বা কী? তারা কি ‘জুলাই শহীদ’? একইরকম ‘জুলাই শহীদ’ তালিকায় জায়গা পাওয়া ২৪ জন যারা কিনা জাবের হোটেল লুট করতে গিয়ে আগুনে নিহত হয়েছেন, তারা কি জুলাই শহীদ হওয়ার যোগ্য? এই ধরনের ঘটনায় নিহত শতাধিক ব্যক্তিরা কি ‘জুলাই শহীদ’ হিসেবেই গণ্য হবেন?

 

জনমনে এসব নানা প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে। প্রশ্নগুলোর সমাধান হওয়া জরুরি। অন্যথায় জুলাইয়ে নিহতদের তালিকা নিয়ে জনমনে যেসব প্রশ্ন, ধারণা ঘুরে বেড়াচ্ছে, সরকারের নীরবতায় সেটিই ‘সত্য’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।