ফ্যাক্ট চেকস
চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতাকে অস্বীকার করে সংসদে প্রতিমন্ত্রীর ‘অসত্য’ ভাষণ! মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় ফজলুর রহমানের নাম না থাকার দাবিটি গুজব! ‘ভুয়া’, ‘নিবন্ধনহীন’ পোর্টালকে সূত্র ধরে রুপপুরে ৫ বিলিয়ন ডলার দুর্নীতির দাবি গণমাধ্যমে! বিএনপি সরকারের ২ মাসেই রাডার! ‘ভারতের হাতে বাংলাদেশের আকাশ’ সহ একাধিক গুজবের ‘ঝড়’! ‘অস্তিত্বহীন’ টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে স্পীকারের ভুল তথ্য, সংবাদমাধ্যমে ‘মিথ্যা’ ছবি প্রচার ইউনিসেফের লেটার প্যাডে ভুয়া অপ্রাসঙ্গিক চিঠি, ‘অন্তর্বর্তী সরকার আমলে ১ হাজার কোটি টাকার টিকা আমদানি’র গুজব ছড়ালেন পিনাকী ব্যারিস্টার ফুয়াদের গলায় ‘জুতার মালা’ পরিয়ে ঘোরানোর ছবিটি এআই
বিএনপি সরকারের ২ মাসেই রাডার! ‘ভারতের হাতে বাংলাদেশের আকাশ’ সহ একাধিক গুজবের ‘ঝড়’!
ফ্যাক্ট চেক

বিএনপি সরকারের ২ মাসেই রাডার! ‘ভারতের হাতে বাংলাদেশের আকাশ’ সহ একাধিক গুজবের ‘ঝড়’!

বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার মাত্র ২ মাসের মধ্যেই শাহজালাল বিমানবন্দরে রাডার চালু করেছে বলে দাবি করা বেশ কিছু পোস্ট সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। Ahnaf Tahmid Arjon নামক একজন একটিভিস্ট লিখেছেন, “বিএনপির ২০০৫ এর এই চলমান প্রজেক্ট সকল বাধা কাটিয়ে অবশেষে ২০২৬ সালের এপ্রিলে ক্ষমতাগ্রহণের মাত্র দুই মাসের মাথায় কার্যকর হলো।“

২০২১ সালে সরকার অনুমোদন করলেও ফান্ডিং দিতে চায় নাই দাবি করে পোস্টে তিনি আরো লেখেন, “এই রাডারটির মাধ্যমে ইতিহাসে প্রথমবারের মত বাংলাদেশের সম্পুর্ন আকাশসীমা এখন বাংলাদেশের পক্ষে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। এর আগে বাংলাদেশের আকাশসীমা কখনোই সম্পুর্ন নিয়ন্ত্রণে ছিলো না সরকারের। “ দেখুন এখানে

তার এই পোস্ট সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকেই শেয়ার করেন। এর মধ্যে অন্যতম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিককালে বিতর্কিত DU Insiders  নামক পেইজটিও এই পোস্ট কপি পেস্ট করে শেয়ার করে। দেখুন 

ফ্যাক্ট-চেক জোন এর অনুসন্ধানে দেখা গেছে এই পোস্টে একাধিক মিথ্যা তথ্য প্রচার করা হয়েছে।

ভুল তথ্য-১: মাত্র ২ মাসেই রাডার চালু করলো বিএনপি!

বিএনপি ক্ষমতায় আসার মাত্র ২ মাসের মধ্যেই শাহজালাল বিমানবন্দরে রাডার চালু করার দাবি সত্য নয়। রাডারের মত এত বড় কারিগরি অবকাঠামো ২ মাসের মধ্যে চালু করা সম্ভবও নয়। ফ্রান্সের রাডার প্রস্তুতকারী কোম্পানি থ্যালাসের সঙ্গে ২০২১ সালের অক্টোবরে চুক্তি করে বেবিচক। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালে নভেম্বরে বসানো হয় এই রাডার। এমনকি ২০২৪ সালের  জানুয়ারি থেকেই এই রাডার থেকে আংশিক সুবিধা পেতে শুরু করেছিল বাংলাদেশ। রাডারে ঢাকা ও চট্টগ্রামের আকাশসীমা নজরদারিতে তখনই এসেছিল বলে জানায় বেবিচক। দেখুন 

প্রসঙ্গত আহনাফ তাহমীদ ইতিমধ্যেই তার পোস্টের ‘২ মাসের মধ্যে রাডার চালুর’ অংশটি এডিট করেছেন।

ভুল তথ্য- ২: “আওয়ামী লীগ সরকার অনুমোদন করে কিন্তু ফান্ডিং দিতে চায়নাই!”

“তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ফান্ডিং দিতে চায় নাই। অত:পর বেবিচকের নিজস্ব অর্থায়নে ৭৩০ কোটি ১৩ লাখ টাকায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হচ্ছে” বলে ছড়িয়ে পড়া পোস্টে আরেকটি দাবি করা হয়েছে ।২০২১ সালের অক্টোবরে চুক্তি হওয়ার আগে সেই বছরের জুন মাসে মন্ত্রীসভা কমিটিতে এই প্রকল্প অনুমোদিত হয়। একটি প্রকল্পকে সরকারী মন্ত্রীসভা কমিটি অনুমোদন দেয়ার পরে সেটিকে ‘ফান্ডিং দিতে চায় নাই’ দাবি করা সম্পূর্ণ অবাস্তব। এমনকি এই প্রকল্প ২০১৭ সালেও একবার অনুমোদন পায়। বেশ কিছু অসংগতি থাকায় পরবর্তীতে সেই চুক্তি ভেস্তে যায়।

ভাইরাল পোস্টের ভাষ্যমতে সরকারের ইচ্ছার বাইরে নিজের ইচ্ছায় ফান্ডিং করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে বেবিচক। বাস্তবে বেবিচক নিজেই বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ একটি সরকারি সংস্থা। মন্ত্রণালয় এবং মন্ত্রীসভার অনুমোদনের বাইরে এই ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের এখতিয়ার তার নেই। এমনকি ২০২১ সালের অক্টোবরে চুক্তি সম্পাদনের সময় উপস্থিত ছিলেন স্বয়ং বেসামরিক বিমান প্রতিমন্ত্রী এম মাহবুব আলীদেখুন 

বরং শেখ হাসিনার সরাসরি হস্তক্ষেপে সাশ্রয় হাজার কোটি টাকা

২০১৭ সালে প্রথম দফায় ১ হাজার ৭৫৫ কোটি টাকায় রাডার ক্রয়ের প্রস্তাবে অনুমোদন দেয় মন্ত্রীসভা কমিটি। পরবর্তীতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরাসরি উদ্যোগে সেই প্রকল্প বাতিল করে ফ্রান্সের সঙ্গে জি-টু-জি পদ্ধতিতে রাডার বসানোর প্রকল্পটি ৭৩০ কোটি টাকায় হাতে নেওয়া। সে যাত্রায় প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপে সাশ্রয় হয় হাজার কোটি টাকা। দেখুন 

পরবর্তীতে এই প্রকল্প ব্যয় বেড়ে ৯৪২ কোটিতে বাস্তবায়িত হয়।

ভুল তথ্য-৩: আগে কখনোই “আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণে ছিল না

বাংলাদেশ আগে কখনোই “আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণে ছিল না” জাতীয় তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। Khair Khaza নামক একজন এক্টিভিস্ট লিখেছেন, “এতোদিন আমাদের আকাশ সীমা ছিল ভারতীয় রাডারের নিয়ন্ত্রণে”। দেখুন এখানে

প্রকৃতপক্ষে এসব দাবি সঠিক নয়। শাহজালালে আগে স্থাপিত রাডারটির অনেক পুরনো হলেও বিভিন্ন সময় আপগ্রেডেশন, ওভারহোলিং করার মাধ্যমে সবসময় সচল ও স্বাভাবিক অপারেশনে ছিল। এমনকি বিগত আওয়ামী সরকার আমলে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরেও নতুন রাডার স্থাপন করা হয়েছে। তাই বাংলাদেশের আকাশ সীমা নিয়ন্ত্রণে না থাকার তথ্যটি মিথ্যা।

বেবিচকের দায়িত্ব বেসামরিক বিমানের রাজস্ব আদায় করা। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির নতুন রাডারে নজরদারির আওতা বেড়েছে। যার ফলে রাজস্ব আদায় আরো নির্ভুলভাবে করা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশের আকাশপথের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করার দায়িত্ব বিমানবাহিনীর। বেবিচকের নয়। সেই আকাশসীমা পাহারার জন্য বিমানবাহিনীর একাধিক রাডার রয়েছে। তাই রাডার ফাঁকি দিয়ে বাংলাদেশের আকাশসীমা অতিক্রম করার সুযোগ আগেও ছিল না, এখনও নেই।

এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকার আমলে বেবিচকের বক্তব্য দেখুন

ভুল তথ্য-৪: ‘বিমানপ্রতি ৫০০ ডলারের রাজস্ব লুট করে নিত ভারত’

বাংলাদেশের রাজস্ব ভারত নিয়ে যেতো বলে বিভিন্ন প্রচারণা হচ্ছে। ২০২৫ সালে একুশে টিভির এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে,” কোন দেশের বাণিজ্যিক বিমান অন্য দেশের আকাশ সীমায় ব্যবহার করলে প্রায় ৫০০ ডলার দিতে হয় সেই দেশকে। অথচ বাংলাদেশের আকাশ সীমায় ব্যবহার করা এ ধরনের উড়োজাহাজের সিগন্যাল রেজিস্টার করা হতো ভারতের রাডার থেকে, আর সেই রাজস্বের পুরোটাই হাতিয়ে নিত দিল্লি। “ প্রতিবেদনে আরো বলা হয় অন্তত ১ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব ভারত হাতিয়ে নিয়েছে। দেখুন

বাস্তবে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে রাজস্ব আদায় হয় International Civil Aviation Organization এর নিয়মে। নিয়ম অনুযায়ী বাংলাদেশের আকাশসীমায় কখন কোন বিমান ঢুকবে তা পূর্ব নির্ধারিত। যদি এক মিনিটের জন্যও কোনও বিমান দেশের আকাশসীমায় প্রবেশ করে, এ জন্য তাদের জানাতে হয় এবং চার্জ প্রযোজ্য হয়। ফলে এই আন্তর্জাতিক নিয়ম ভেঙ্গে এক দেশের রাজস্ব আরেক দেশের সিগনাল রেজিস্টারের ভিত্তিতে আদায়ের কোন সুজোগ নেই। তাই বাংলাদেশের সীমানার ভেতরে কোন বিমান ঢুকলে, তার রাজস্ব যদি প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশ আদায় না করেও থাকে, সেটি ভারতের পক্ষে আদায় করা সম্ভবই নয়। এছাড়াও, ফিক্সড ৫০০ ডলার বিলেরও কোন নিয়ম নেই।

ICAO-এর অফিসিয়াল ডকুমেন্ট (Doc 9082) অনুযায়ী “Charge based essentially on distance flown and aircraft weight” অর্থাৎ “চার্জ মূলত নির্ধারিত হয় উড়োজাহাজ কত দূরত্ব অতিক্রম করেছে এবং তার ওজনের উপর ভিত্তি করে।”

এই দূরত্ব বা ওজনের পরিমাপ নির্ধারণে সঠিক তথ্য প্রদানে রাডারের বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। যার কারণে রাজস্ব হারাতো বাংলাদেশ। বেবিচক সূত্র জানায়, ওভারফ্লাইং চার্জ বাবদ গত প্রায় ৯ অর্থবছরে প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে থেকে ১ হাজার ৮০০ কোটি আয় হয়েছে। সেখানে নতুন রাডার স্থাপনের কারণে আড়াই থেকে ৩ হাজার কোটি টাকার ঘরে আয় দাঁড়াবে। মূলত পুরাতন রাডারের সীমাবদ্ধতার কারণেই গত ৯ বছরে ১ হাজার কোটির রাজস্ব হারায় বাংলাদেশ। বেবিচকের বক্তব্য দেখুন

ফ্যাক্ট-চেক জোন সিদ্ধান্ত;

মাত্র ২ মাসের মধ্যেই বিএনপি সরকার রাডার বসানোর দাবিটি মিথ্যা। একইভাবে বাংলাদেশের আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণে না থাকা এবং ‘বাংলাদেশের রাজস্ব ভারত নিয়ে যাওয়ার’ দাবিগুলো গুজব।