ফ্যাক্ট চেকস
ফাইনালে মেসির পরিবার অনুপস্থিত থাকার দাবিটি সত্য নয়! কথিত ‘মুক্তিযোদ্ধা’ জামাত এমপি গাজী নজরুলের নেই মুক্তিযোদ্ধা সনদ, সংসদে দাঁড়িয়ে করেন বিকৃত ইতিহাস প্রচার! আসামের শিক্ষক প্রশিক্ষণের ভিডিওকে বাংলাদেশের দাবি করে গুজব ছড়ালেন ‘আমার দেশ’ এর স্টাফ রিপোর্টার ‘বন্যায় ইউনুসের দশ হাজার কোটি টাকার সহায়তা’,-স্যাটায়ার পোস্টকে সত্য ভেবে শেয়ার দিচ্ছেন ইউনুসপন্থী এক্টিভিস্টরা! ফ্যাক্ট চেক: পরীক্ষার্থীদের ভোগান্তি নিয়ে সংসদে শিক্ষামন্ত্রীর দেয়া বক্তব্য সঠিক নয় “একাত্তরের পর প্রণীত দুইশো জন যুদ্ধাপরাধীর তালিকায় জামাত নেতাদের নাম নেই”-মারদিয়া মমতাজের দাবিটি মিথ্যা! ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ আজহারউদ্দীন পুত্র বীর বিক্রম মেজর হাফিজের ক্রমাগত ইতিহাস বিকৃতি!
“ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলীকে হত্যা করেছিল শেখ মুজিব”,- ব্যারিস্টার শাহরিয়ারের ইতিহাস বিকৃতি!
ফ্যাক্ট চেক

“ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলীকে হত্যা করেছিল শেখ মুজিব”,- ব্যারিস্টার শাহরিয়ারের ইতিহাস বিকৃতি!

সম্প্রতি জামাত নেতা শাহরিয়ার কবির দাবি করেছেন শেখ মুজিব ১৯৫৭ সালে পার্লামেন্টে তৎকালীন ডেপুটি স্পীকার শাহেদ আলীকে চেয়ার ছুড়ে হত্যা করেছিল। তিনি বলেন, ‘ ৫৭ সালে পার্লামেন্টে চেয়ার ছুড়ে দিয়ে ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলীকে যখন হত্যা করলো শেখ মুজিব, সেদিন যদি তাকে ফাঁসি দেয়া হতো তাহলে আজকের এই নির্মম পরিণতি এই জাতির হতো না।” দেখুন 

ফ্যাক্ট-চেক

ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলীর ‘হত্যার’ ঘটনাটি ১৯৫৭ সালে নয়, ১৯৫৮ সালে সংঘটিতে হয়েছিল।  হত্যার সাথে বঙ্গবন্ধুর সংশ্লিস্টতা থাকার দাবিটি সত্য নয়। এমনকি তৎকালীন আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট কেউই এই হত্যাকান্ডে জড়িত ছিল না। শাহেদ আলী নিজেই আওয়ামী লীগের নেতা ছিলেন এবং আওয়ামী লীগ দ্বারা প্রস্তাবিত ‘স্পিকার’ ছিলেন।

 

ঐতিহাসিক পটভূমি

ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলীর হত্যাকান্ড সম্পর্কে জানতে হলে আপনাকে একটু পেছনে আসতে হবে।

১৯৫৮ সালে পূর্ব পাকিস্তানে আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের কোয়ালিশন সরকার ক্ষমতায় ছিল, কিন্তু স্পিকার আবদুল হাকিম ছিলেন বিরোধী দল কৃষক শ্রমিক পার্টির (KSP)। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে তীব্র রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ আনা হয়। শেখ মুজিবুর রহমানসহ আওয়ামী লীগ নেতারা অভিযোগ করেন যে, স্পিকার নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন না করে সক্রিয়ভাবে বিরোধী দলের রাজনীতি করছেন। স্পিকারের এই ভূমিকার কারণে আওয়ামী লীগ কোয়ালিশন সরকারের সদস্যরা তাঁর বিরুদ্ধে সংসদে অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন করেন। সরকারের এই অনাস্থা প্রস্তাবের মুখে স্পিকার আবদুল হাকিমকে সরিয়ে তার অনুপস্থিতিতে আওয়ামী লীগ সদস্য তথা ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলী পাটোয়ারীকে অস্থায়ী বা ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সরকারি দল এবং বিরোধী দলের মধ্যে চরম দ্বন্দ্ব দেখা দেয়।

২৩ সেপ্টেম্বর অধিবেশন চলাকালে শাহেদ আলী স্পিকারের আসন গ্রহণের সময় বিরোধী দল কেএসপি হট্টগোল করতে থাকে এবং স্পিকারের দিকে তারা বিভিন্ন বস্তু ছুড়তে থাকে। এই সময় ভারী কোন কাঠের বস্তু শাহেদ আলীর মাথায় আঘাত হানে এবং তিনি মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হন। ৫৮ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ‘আজাদ’ পত্রিকার প্রথম পাতায় এই বিষয়ক প্রকাশিত সংবাদে এসব তথ্য পাওয়া যায়।

 

দৈনিক আজাদ (২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৫৮ সংখ্যা)

একইদিন মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমানের বিবৃতিতেও বিরোধী দলের এই আক্রমনে স্পিকার শাহেদ আলীকে হত্যাচেস্টার তীব্র নিন্দা প্রকাশ করা হয়।

এই ঘটনার ২ দিন পর ২৫শে সেপ্টেম্বর ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলী হাসপাতালে মারা যান। সেসময় শাহেদ আলীর ডেথ রিপোর্টে মৃত্যুর কারণ হিসেবে লেখা হয়, “বহুমূত্র, মূত্রাশয়ের গোলযোগ, অত্যাধিক রক্তচাপের ফলে হৃদযন্ত্র আক্রান্ত হওয়া এবং মুখের আঘাতে”।

দৈনিক আজাদ (২৬ সেপ্টেম্বর ১৯৫৮ সংখ্যা)

 

বিরোধী দলীয় নেতাদের দায় এড়ানোর চেষ্টা, অতঃপর মামলার আসামী

২৬শে সেপ্টেম্বর পত্রিকায় প্রকাশিত বিবৃতিতে বিরোধী দলীয় নেতা আবু হোসেন সরকার শাহেদ আলীর মৃত্যুর দায় এড়াতে একে ‘রোগজনিত মৃত্যু’ বলে অভিহিত করেন। তবে ইতিমধ্যেই চিকিৎসকরা ডেথ রিপোর্টে ‘মুখের আঘাত’ কেও কারণ হিসেবে দায়ী করেন।

দৈনিক আজাদ ২৬ সেপ্টেম্বর ১৯৫৮ সংখ্যায় প্রকাশিত বিবৃতি

পরবর্তীতে শাহেদ আলীকে হত্যাচেষ্টার মামলা করা হয়। তবে মামলায় অভিযুক্তদের তালিকায় বঙ্গবন্ধুর নাম ছিলনা।  বিরোধী দলীয় নেতা আবুল হোসেন সরকার সহ ১২ জনের বিরুদ্ধে এই মামলা দায়ের করা হয় এবং ২৯ সেপ্টেম্বর আদালতে আসামীদের হাজির করা হয়।

 আদালতে পাবলিক প্রসিকিউটর বলেন, “২৩ সেপ্টেম্বর পরিষদে জনাব ইউসুফ আলী চৌধুরী  একটি চেয়ারের পায়া ছুড়ে মারিলে ডেপুটি স্পীকার আহত হন এবং পরবর্তীতে ইন্তেকাল করেন।” 

আসামী পক্ষের উকিল আলী আমজাদ খান ডিফেন্স করতে গিয়ে বলেন, “২৩শে সেপ্টেম্বরকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখিলে হইবে না। ইহা ২৩শে সেপ্টেম্বরের ঘটনাবলীর পরিণতি।” তিনি আরো বলেন,” ঐদিন ডেপুটি স্পিকার একটি অবৈধ আসন গ্রহণ করেন এবং পরিষদ ভবনে তাহার প্রবেশই অনধিকার প্রবেশের শামিল।”

এসময় আসামী পক্ষের উকিল ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনকে সাজানো দাবি করে বলেন, “মেডিকেল রিপোর্টে বহুমূত্রজনিত সংজ্ঞাহীনতার কথা বলা হইয়াছে। কোন চিকিৎসকের রিপোর্টে হাড় ভাঙ্গার কথা উল্লেখ নাই। অথচ ময়নাতদন্তে পাঁজরার হাড় ভাঙ্গিয়া গিয়াছে বলে উল্লেখ করা হইয়াছে।”

অর্থাৎ স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে শাহেদ আলী হত্যাকান্ডের প্রক্রিয়ার কোথাও শেখ মুজিবের নাম কখনোই আসেনি। এমনকি বিরোধী দলীয় উকিলও আদালতে দাঁড়িয়ে তেমন কোন দাবি করেননি। বরং তিনি হত্যার দায় এড়াতে মেডিকেল প্রতিবেদনে উল্লেখিত বহুমূত্র, উচ্চ রক্তচাপকে মৃত্যুর কারণ হিসেবে দায়ী করেন। সেদিন অভিযুক্ত ১২ জনকেই জামিন দেয়া হয়।

 

মামলায় অভিযুক্তদের নাম

পরবর্তীতে এসব রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে কয়েক সপ্তাহের মাথায় ২৭ অক্টোবর আইয়ুব খান সংসদীয় সরকার তথা আওয়ামী লীগ কোয়ালিশন সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে সামরিক শাসন জারি করে। এর ফলে কেএসপি, আওয়ামী লীগসহ সব রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ হয়ে যায়। অর্থাৎ শাহেদ আলী হত্যার ভুক্তভোগী ছিল স্বয়ং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।

ফ্যাক্ট-চেক জোন সিদ্ধান্ত: ‘ডেপুটি স্পীকার শাহেদ আলীকে চেয়ার ছুড়ে শেখ মুজিব হত্যা করেছেন’ বলে উদ্দেশ্যমূলক ‘প্রপাগান্ডা’ চালাচ্ছেন ব্যারিস্টার শাহরিয়ার।