আওয়ামী লীগ শাসনামলে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার : সংসদে তারেক রহমানের বক্তব্য বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা

ফ্যাক্ট চেক জোন টিম

দাবি: গত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগ সরকার ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার করেছে।

দাবিকারী:   মহান সংসদে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই দাবি করেছেন।

ফ্যাক্ট-চেক জোন রেটিং: বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা

১. দাবির প্রেক্ষাপট

সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উক্ত দাবি করার পর সামাজিক মাধ্যমে এই দাবি ছড়িয়েছে যে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার করা হয়েছে। এই তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ে আমরা সরকারের মোট বাজেট, উন্নয়ন ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বিশ্লেষণ করেছি।

২. গাণিতিক বিশ্লেষণ ও বাজেটের আকার

গত ১৫ বছরের (২০০৯-১০ থেকে ২০২৩-২৪) মোট ১৫টি বাজেটের যোগফল ছিল প্রায় ৫৬.৫ ট্রিলিয়ন টাকা। তৎকালীন গড় ডলার রেট বিবেচনা করলে যার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫৬৫ বিলিয়ন ডলার

আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের পূর্ণাঙ্গ বাজেট তালিকা

অর্থবছর বাজেট পেশকারী পরিমাণ (কোটি টাকা)
২০০৯-১০ আবুল মাল আবদুল মুহিত ১,১৩,৮১৫
২০১০-১১ আবুল মাল আবদুল মুহিত ১,৩২,১৭০
২০১১-১২ আবুল মাল আবদুল মুহিত ১,৬৩,৫৮৯
২০১২-১৩ আবুল মাল আবদুল মুহিত ১,৯১,৭৩৮
২০১৩-১৪ আবুল মাল আবদুল মুহিত ২,২২,৪৯১
২০১৪-১৫ আবুল মাল আবদুল মুহিত ২,৫০,৫০৬
২০১৫-১৬ আবুল মাল আবদুল মুহিত ২,৯৫,১০৯
২০১৬-১৭ আবুল মাল আবদুল মুহিত ৩,৪০,৬০৫
২০১৭-১৮ আবুল মাল আবদুল মুহিত ৪,০০,২৬৬
২০১৮-১৯ আবুল মাল আবদুল মুহিত ৪,৬৪,৫৭৩
২০১৯-২০ আ হ ম মুস্তফা কামাল ৫,২৩,১৯০
২০২০-২১ আ হ ম মুস্তফা কামাল ৫,৬৮,০০০
২০২১-২২ আ হ ম মুস্তফা কামাল ৬,০৩,৬৮১
২০২২-২৩ আ হ ম মুস্তফা কামাল ৬,৭৮,০৬৪
২০২৩-২৪ আ হ ম মুস্তফা কামাল ৭,৬১,৭৮৫

যুক্তি: যদি ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার হওয়ার দাবিটি সত্য হয়, তবে এর অর্থ হলো মোট বাজেটের প্রায় ৪১.৪% টাকাই পাচার হয়ে গেছে। একটি উন্নয়নশীল দেশে বাজেটের প্রায় অর্ধেক পাচার হয়ে গেলে রাষ্ট্র পরিচালনা এবং দৃশ্যমান মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা অসম্ভব হয়ে পড়ত।

৩. উন্নয়নের সচিত্র প্রতিবেদন ও ব্যয় বিশ্লেষণ (২০০৯-২০২৪)

প্রকল্পের নাম সময়কাল ব্যয় (কোটি টাকা) বিশেষত্ব
পদ্মা বহুমুখী সেতু ২০১৪ – ২০২২ ৩২,৬০৫ নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত দীর্ঘতম সেতু।
রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প ২০১৬ – বর্তমান ১,১৩,০৯২ দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র।
ঢাকা মেট্রো রেল (MRT-6) ২০১২ – ২০২৩ ৩৩,৪৭২ যানজট নিরসনে প্রথম মেট্রো রেল।
বঙ্গবন্ধু টানেল ২০১৭ – ২০২৩ ১০,৬৮৯ নদীর তলদেশে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম টানেল।
পদ্মা সেতু রেল সংযোগ ২০১৬ – ২০২৪ ৩৯,২৪৬ ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত সরাসরি সংযোগ।
মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দর ২০২০ – বর্তমান ১৭,৭৭৭ বাণিজ্যিক হাব হিসেবে পরিচিতি।

বিশ্লেষণ: এই মেগা প্রকল্পগুলোতে মোট ব্যয় হয়েছে কয়েক লক্ষ কোটি টাকা। এছাড়া ডিজিটাল বাংলাদেশ উদ্যোগ, বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি (৫০০ মেগাওয়াট থেকে ২৮,০০০ মেগাওয়াট) এবং ৪-লেন হাইওয়ে নির্মাণে বাজেটের একটি বিশাল অংশ ব্যয় হয়েছে। আরও শত শত ছোট-বড় প্রকল্প (ফ্লাইওভার, হাইওয়ে, বিদ্যুৎ কেন্দ্র) মিলিয়ে উন্নয়ন খাতে কয়েক শত বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। যদি ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার হতো, তবে এই প্রকল্পগুলোর অর্থায়ন থমকে যেত।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যে যেখানে ৬৮.৩ বিলিয়ন ডলার বা ৬৮৩০ কোটি ডলার সংখ্যাটি বলা হয়েছে, সেটি একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা GFI-এর রিপোর্ট থেকে এসেছে।

কিন্তু GFI সরাসরি বলেনি যে এই পুরো টাকাই নিশ্চিতভাবে পাচার হয়েছে। তারা বলেছে, এটা বাণিজ্যের হিসাবের অমিল দেখে করা একটি ঝুঁকির হিসাব।

রিপোর্টে তারা লিখেছে, এটি “not as a direct measure of proven illicit proceeds”, মানে এটি প্রমাণিত পাচারের সরাসরি হিসাব নয়।

তারা আরও বলেছে, এই কাজটি করা হয়েছে “to estimate the order of magnitude of trade misinvoicing risks”, অর্থাৎ বাণিজ্যে ভুল বা গরমিলের কারণে কত বড় ঝুঁকি থাকতে পারে, তার একটা আন্দাজ বের করতে।

এখানে সহজ করে দেখা যাক।

ধরুন, আপনি বললেন,  আপনি ১০০ টাকার ১০টা খাতা বিক্রি করেছেন । কিন্তু আপনার বন্ধু লিখল সে ১২০ টাকার খাতা কিনেছে। এখানে ২০ টাকার গরমিল দেখা গেল। এই গরমিল দেখে সন্দেহ করা যেতে পারে কিছু একটা ভুল আছে।

কিন্তু শুধু গরমিল দেখেই বলা যায় না যে টাকা চুরি হয়েছে। প্রথমে দেখতে হবে হিসাব ভুল হয়েছে কি না, দাম লেখায় ভুল হয়েছে কি না, নাকি অন্য কোনো কারণে পার্থক্য হয়েছে। GFI-এর হিসাবও এমনই। তারা গরমিল দেখেছে, কিন্তু সেই গরমিলকে সরাসরি “প্রমাণিত পাচার” বলেনি।

৪. কেন ২৩৪ বিলিয়ন ডলারের দাবিটি বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা?

২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচারের দাবির যৌক্তিকতা:

  • বাজেটের সাথে তুলনা: গত ১৫ বছরের মোট বাজেটের যোগফল ছিল প্রায় ৫৬৫ বিলিয়ন ডলার। যদি ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়ে থাকে, তবে তার অর্থ হলো সরকারের মোট বাজেটের প্রায় ৪১% টাকাই পাচার হয়েছে।
  • জিডিপির সাথে তুলনা: বর্তমানে বাংলাদেশের জিডিপির আকার প্রায় ৪৫০ বিলিয়ন ডলার। ২৩৪ বিলিয়ন ডলার মানে হলো দেশের বর্তমান মোট অর্থনীতির অর্ধেকেরও বেশি পরিমাণ অর্থ।
  • উন্নয়ন বনাম পাচার: যখন পদ্মা সেতু, মেট্রো রেল বা পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো বিশাল অবকাঠামো দৃশ্যমান হয়, তখন বোঝা যায় বাজেটের একটি বড় অংশ বাস্তবে খরচ হয়েছে। বাজেটের ৪১% পাচার হলে এই অর্থ সংস্থান অসম্ভব হতো।
  • অসম্ভব পরিসংখ্যান: ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার মানে হলো দেশের মোট অর্থনীতির অর্ধেকের বেশি অর্থ গায়েব হয়ে যাওয়া, যা কোনোভাবেই একটি স্থিতিশীল অর্থনীতির পক্ষে সম্ভব নয়।
  • রাজনৈতিক উদ্দেশ্য: দাবিকারী কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাংক স্টেটমেন্ট বা আন্তর্জাতিক অডিট রিপোর্ট পেশ করেননি। এটি মূলত একটি রাজনৈতিক ও আবেগীয় বক্তব্য।

৫. ফ্যাক্ট-চেক বিশ্লেষণ

পাচারের বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা (যেমন GFI – Global Financial Integrity) কাজ করে। তাদের বিভিন্ন সময়ের রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর গড়ে ৭-৮ বিলিয়ন ডলার পাচার হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। ১৫ বছরে সেই হিসেবে একটি তাত্ত্বিক হিসাব আসতে পারে (যদিও এর সিংহভাগই আমদান-রপ্তানির আড়ালে ব্যবসায়িক পাচার)।

যৌক্তিকতা: ২৩৪ বিলিয়ন ডলারের দাবিটি গাণিতিকভাবে অতিরঞ্জিত। কারণ: ১. এটি গত ১৫ বছরের মোট সরকারি বরাদ্দের প্রায় অর্ধেক। ২. এত বিশাল পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে চলে গেলে অর্থনীতি অনেক আগেই অচল হয়ে পড়ত এবং দৃশ্যমান উন্নয়নগুলো সম্ভব হতো না।

৬. প্রকৃত পাচারের পরিমাণ জানার সঠিক মাধ্যম

সত্যিকার অর্থে কত টাকা পাচার হয়েছে বা হতে পারে, তা জানতে হলে নিচের নির্ভরযোগ্য উৎসগুলো দেখা প্রয়োজন:

  • Global Financial Integrity (GFI): ওয়াশিংটন ভিত্তিক এই সংস্থাটি প্রতি বছর উন্নয়নশীল দেশগুলোর অবৈধ অর্থ পাচারের রিপোর্ট প্রকাশ করে।
  • সুইস ব্যাংক রিপোর্ট (SNB): সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানতের বার্ষিক বিবরণী।
  • বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএফআইইউ (BFIU): বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো হুন্ডি এবং পাচার হওয়া অর্থের হিসাব তদন্ত করে।
  • পানামা ও প্যারাডাইস পেপারস: আন্তর্জাতিকভাবে ফাঁস হওয়া নথিপত্র যেখানে পাচারকারী ও কর ফাঁকিবাজদের নাম থাকে।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

আমাদের ফ্যাক্ট-চেক অনুযায়ী, “২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার” হওয়ার দাবিটি গাণিতিকভাবে অযৌক্তিক এবং প্রমাণের অভাবে ভিত্তিহীন। এটি একটি রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা হিসেবে প্রতীয়মান। দাবিটি বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা প্রমাণিত।

তথ্যসূত্র: অর্থ মন্ত্রণালয় (বাংলাদেশ), বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS), মেগা প্রকল্প সমূহের অফিসিয়াল রিপোর্ট এবং Global Financial Integrity (GFI) ডেটাবেজ।

Share on Social Media

Previous Post
Next Post

Related Posts

Find Us On Social Media

সর্বশেষ প্রকাশিত

Ownership & Funding:

An initiative of THE

BRICKLANE NEWS LIMITED

(Company No-10776054)

You have been successfully Subscribed! Ops! Something went wrong, please try again.

Related Links

Awards

Success Story

Address

Copyright © 2026 Fact Check Zone | An initiative of Bricklane News Ltd | All rights reserved.