১. দাবির সারাংশ
‘যমুনা’র সামনে আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে বা সংঘর্ষে একাধিক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন বলে গুজব ছড়ানো হচ্ছে’
দাবির সারসংক্ষেপ: সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দাবি অনুযায়ী, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে পরবর্তী কয়েক দিনে ঢাকার মিন্টো রোডে অবস্থিত প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন ‘যমুনা’র সামনে আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে বা সংঘর্ষে একাধিক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। কিছু পোস্টে মৃতের সংখ্যা নির্দিষ্ট করে (যেমন: ৩ জন বা তার বেশি) উল্লেখ করা হয়েছে। ফেসবুকে দেখুন এখানে , এখানে , এবং এখানে

এছাড়াও ফেব্রুয়ারি ৫ ও ৬, ২০২৬ তারিখে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন ‘যমুনা’র সামনে আন্দোলনে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল জাবের এবং অন্যান্যরা পুলিশের গুলিতে ‘গুলিবিদ্ধ’ হয়েছেন বলে দাবি করা হচ্ছে ।
দাবির উৎস ও প্রেক্ষাপট:
-
উৎস: ইনকিলাব মঞ্চের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ এবং আন্দোলনকারীদের সমর্থক বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম প্রোফাইল।

-
প্রেক্ষাপট: নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন এবং শরীফ ওসমান হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে যমুনার সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালনকালে পুলিশ জলকামান, সাউন্ড গ্রেনেড ও লাঠিচার্জ করে। এরপরই ‘গুলিবিদ্ধ’ হওয়ার এবং মৃতের সংখ্যা নিয়ে দাবিগুলো সামনে আসে।এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে হতাহতের বিষয়ে অতিরঞ্জিত তথ্য ছড়ানো হয়।
ফ্যাক্ট-চেকিং অনুসন্ধানঃ
যাচাইকৃত তথ্যের ভিত্তিতে প্রাপ্ত ফলাফল নিচে তুলে ধরা হলো:
আন্দোলনের ধরন: ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে ইনকিলাব মঞ্চ এবং সরকারি কর্মচারী দাবি আদায় ঐক্য পরিষদ যমুনার সামনে অবস্থান নেয়। পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে জলকামান, সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল ব্যবহার করে।
আহত হওয়ার তথ্য: সংঘর্ষে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল জাবের এবং ডাকসু নেত্রী ফাতেমা তাসনিম জুমা সহ ৩০ জনের বেশি আন্দোলনকারী আহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন মূলধারার সংবাদমাধ্যম (যেমন: প্রথম আলো, সময় টিভি , যুগান্তর, ইত্তেফাক ) নিশ্চিত করেছে।
মৃতের সংখ্যা: সরকারি সূত্র, হাসপাতাল রিপোর্ট বা নির্ভরযোগ্য কোনো সংবাদমাধ্যম যমুনার সামনের এই আন্দোলনে কোনো মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেনি। তবে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুক ও ইউটিউবের অনেক আইডি থেকে এই খবর ছড়ানো হয় ।
-
হাসপাতালের ভাষ্য: ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (ঢামেক) জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসকরা জানিয়েছেন যে, আব্দুল্লাহ আল জাবেরসহ মোট ২৩ জন সেখানে চিকিৎসা নিয়েছেন। চিকিৎসকদের স্পষ্ট বক্তব্য— কারও শরীরেই গুলির আঘাত (Bullet wound) পাওয়া যায়নি।
-
আঘাতের ধরন: ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থা ও হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, আব্দুল্লাহ আল জাবেরের শরীরে যে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে তা পুলিশের ছোঁড়া সাউন্ড গ্রেনেডের স্প্লিন্টার বা শেলের কারণে হয়েছে। অন্য নেতা মহিউদ্দিন রনি আহত হয়েছেন পুলিশের লাঠিচার্জে।
-
সরকারের বক্তব্য: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কেবল সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেল এবং জলকামান ব্যবহার করা হয়েছে; কোনো প্রকার আগ্নেয়াস্ত্র বা প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করা হয়নি।
বিভ্রান্তির উৎস: ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড় এবং শাহবাগে পুলিশের হার্ডলাইন অ্যাকশনের ভিডিও ক্লিপ ব্যবহার করে “লাশ পড়ে আছে” বা “গুলি করে মারা হয়েছে” মর্মে গুজব ছড়ানো হয়েছে। অথচ আহতরা বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।
আইএফসিএন নীতিমালা মূল্যায়নঃ
ক. প্রতিবেদনটি কেবল সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি, কোনো পক্ষকে সমর্থন বা আক্রমণ করা হয়নি।
খ. সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ‘গুলিবিদ্ধ’ হওয়ার দাবি এবং হাসপাতালের ডাক্তারদের ‘মেডিকেল রিপোর্ট’—উভয়কেই সমান গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করা হয়েছে।
গ. তথ্যের জন্য বিডিনিউজ২৪, কালবেলা, এবং একুশে টিভির মতো মূলধারার গণমাধ্যম ব্যবহার করা হয়েছে।
ঘ. গুগল সার্চ, সংবাদপত্রের আর্কাইভ যাচাই এবং সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওর উৎস বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই ফ্যাক্ট-চেক করা হয়েছে।
Verdict (সিদ্ধান্ত)
⚠️ PARTLY TRUE / MISLEADING (আংশিক সত্য / বিভ্রান্তিকর)
ব্যাখ্যাঃ
যমুনার সামনে আন্দোলন এবং পুলিশের সাথে সংঘর্ষের ঘটনাটি সত্য। সংঘর্ষে অনেকে আহতও হয়েছেন। তবে আন্দোলনে একাধিক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন বলে যে দাবিটি সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত হচ্ছে, তার কোনো সত্যতা বা নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আহত হওয়ার সংবাদকে অতিরঞ্জিত করে গুলিবিদ্ধ এবং মৃত্যুর গুজব হিসেবে ছড়ানো হয়েছে।
পরামর্শঃ
স্প্লিন্টারের আঘাত অনেক সময় বাইরে থেকে গুলির ক্ষতের মতো মনে হতে পারে। তবে ফরেনসিক বা মেডিকেল রিপোর্ট ছাড়া সরাসরি ‘গুলিবিদ্ধ’ বলা সাংবাদিকতার নীতিমালা পরিপন্থী। সাধারণ পাঠকদের উচিত যেকোনো রক্তক্ষয়ী ছবির সাথে দেওয়া ক্যাপশন দেখেই তা বিশ্বাস না করে হাসপাতালের অফিসিয়াল স্টেটমেন্টের অপেক্ষা করা।
জনগণকে অনুরোধ করা হচ্ছে, যে কোনো সেনসিটিভ নিউজ শেয়ার করার আগে মূলধারার সংবাদমাধ্যমের লাইভ আপডেট বা নির্ভরযোগ্য সংবাদ পোর্টাল যাচাই করুন। অস্পষ্ট ভিডিও দেখে মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো থেকে বিরত থাকুন।




