শেখ হাসিনা কি হিন্দুদের নিয়ে “দুই নৌকায় পা” এমন মন্তব্য করেছিলেন?

ফ্যাক্ট চেক জোন টিম
সিদ্ধান্ত: বিভ্রান্তিকর / MISLEADING ⚠️

দাবির সারাংশঃ  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও লোকমুখে একটি দাবি প্রচলিত রয়েছে যে, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হিন্দু সম্প্রদায়কে উদ্দেশ্য করে মন্তব্য করেছিলেন, তাদের “দুই নৌকায় পা” (অর্থাৎ বাংলাদেশ ও ভারত দুই দেশেই আনুগত্য বা অবস্থান) রয়েছে।

উৎস ও প্রেক্ষাপটঃ এই দাবিটি মূলত ফেসবুক পোস্ট, রাজনৈতিক ব্লগ এবং বিরোধীদের বক্তৃতায় ব্যবহৃত হয়। দাবিটির স্বপক্ষে কোনো ভিডিও ফুটেজ সাধারণত দেওয়া হয় না, বরং উদ্ধৃতি চিহ্ন (” “) ব্যবহার করে এটিকে শেখ হাসিনার সরাসরি বক্তব্য হিসেবে প্রচার করা হয়। এর উদ্দেশ্য মূলত শেখ হাসিনার ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা বা হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি তাঁর কঠোর মনোভাব প্রকাশ করা। ফেসবুকে এই শিরোনামে,  ‘শেখ হাসিনা বলতেন হিন্দুদের এক পা বাংলাদেশে আর এক পা ভারতে, আর এখন সেই দুই পা নিয়ে নিজেই ভারতে আশ্রয় নিলেন’  এখানে দেখুন এই বক্তব্য প্রচারিত হয়েছে ।

ফ্যাক্ট-চেকিং ফলাফলঃ

সরকারি ও সংবাদ মাধ্যমের অনুসন্ধান: গত দুই দশকের প্রধান সংবাদ মাধ্যম (প্রথম আলো, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর, ডেইলি স্টার, বিবিসি বাংলা) এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রকাশিত ভাষণসমূহের আর্কাইভে শেখ হাসিনার কণ্ঠে “হিন্দুদের দুই নৌকায় পা” বা সমার্থক কোনো বাক্যের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

বিপরীত প্রমাণ : অনুসন্ধানে দেখা যায়, শেখ হাসিনা ধারাবাহিকভাবে হিন্দু সম্প্রদায়কে “সংখ্যালঘু” না ভাবার এবং নিজেদের এই দেশের সমান অধিকারপ্রাপ্ত নাগরিক মনে করার আহ্বান জানিয়েছেন। দেখুন এই লিংকে 

উদাহরণ ১: ২০১৯ সালের জন্মাষ্টমীর অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “নিজেদের সংখ্যালঘু ভাববেন না। এই দেশ আপনাদের, আপনারা এই মাটির সন্তান।” (সূত্র: বাসস/প্রথম আলো)

উদাহরণ ২: ২০২২ সালে তিনি বলেন, “কেন আপনারা নিজেদের সংখ্যালঘু বলেন? আপনারা এ দেশের নাগরিক, সমান অধিকার আপনাদের।” (সূত্র: সমকাল )

উদাহারন ৩: কলামিস্ট অজয় দাশগুপ্ত লিখেছেন,  শেখ হাসিনাও মুখের ওপর বলে দিয়েছিলেন হিন্দুরা দুই নৌকায় পা রাখে বলেই বিপদ। (সুত্র: বিডি নিউজ )

প্রবাদটির ভিন্ন ব্যবহার: “দুই নৌকায় পা” প্রবাদটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রায়শই ব্যবহৃত হয়, তবে তা ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। যেমন, জাতীয় পার্টির রাজনৈতিক অবস্থান বা কোনো নেতার দ্বিমুখী নীতি বোঝাতে এটি ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু শেখ হাসিনা এটি হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি ব্যবহার করেছেন, এমন কোনো প্রমাণ নেই।

সাম্প্রতিক অবস্থান (২০২৪-২৫): ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরেও ভারতীয় গণমাধ্যম বা আন্তর্জাতিক সাক্ষাৎকারে তিনি বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর নির্যাতনের নিন্দা জানিয়েছেন এবং তাদের সুরক্ষার দাবি তুলেছেন। সেখানেও তাদের আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো রেকর্ড নেই।

  • দাবিকৃত উক্তি বনাম প্রকৃত উক্তি: শেখ হাসিনার কোনো অফিশিয়াল ভাষণ বা দলিলে “হিন্দুদের দুই নৌকায় পা” বা “দুই নৌকায় পা দিয়ে চলা” শীর্ষক হুবহু কোনো বাক্যের অস্তিত্ব নেই। এটি একটি ভুল উদ্ধৃতি ।

  • প্রকৃত তথ্যের উৎস : দাবিটির মূল ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায় বাংলাদেশের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ও বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান রচিত ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঘটনাপঞ্জি: ১৯৭১–২০১১’ (প্রথম প্রকাশ: অক্টোবর ২০১৩, প্রথমা প্রকাশন) বইতে।বাংলাদেশের নাগরিক হওয়ার চেষ্টা করুন, . এক পা ভারতে আর এক পা বাংলাদেশে রাখবেন না। বাঙালি হওয়ার চেষ্টা করুন। অর্পিত সম্পত্তি আইন বাতিল করব না॥” – মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা  তারিখ: ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৯৯।

    • স্থান: নিউ ইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র।

    • প্রেক্ষাপট: শেখ হাসিনা হিন্দু–বৌদ্ধ–খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করছিলেন।

    • বইয়ে উল্লেখিত বক্তব্য: বইটির তথ্যমতে, শেখ হাসিনা নেতাদের উদ্দেশ্যে বলেন, বাংলাদেশের নাগরিক হওয়ার চেষ্টা করতে হবে এবং “এক পা ভারতে আর এক পা বাংলাদেশে” রাখা উচিত নয়। তিনি সেখানে বাঙালি পরিচয়ের ওপর জোর দেন এবং অর্পিত সম্পত্তি আইন বাতিল না করার রাজনৈতিক অবস্থান ব্যক্ত করেন।

  • বিভ্রান্তির ধরণ :

    • শব্দগত পরিবর্তন: শেখ হাসিনা বলেছিলেন, “এক পা ভারতে আর এক পা বাংলাদেশে”। সামাজিক মাধ্যমে এটিকে ইডিয়ম বা প্রবাদ বাক্যে রূপান্তর করে “দুই নৌকায় পা” বানানো হয়েছে।

    • শ্রোতা বনাম লক্ষ্যবস্তু: মূল বক্তব্যে তিনি নির্দিষ্ট একটি সংগঠনের (ঐক্য পরিষদ) নেতাদের রাজনৈতিক অবস্থান ও নাগরিকত্ব নিয়ে কথা বলেছিলেন। কিন্তু ভাইরাল দাবিতে সেটিকে জেনারেলাইজ বা সাধারণীকরণ করে “সমগ্র হিন্দু সম্প্রদায়ের” ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।

আইএফসিএন (IFCN) নীতিমালার আলোকে মূল্যায়ন

  • ক. নিরপেক্ষতা ও ন্যায্যতা: দাবিটি যাচাই করার জন্য রাজনৈতিক পক্ষপাতের ঊর্ধ্বে উঠে শুধুমাত্র লিখিত ঐতিহাসিক দলিল (বিচারপতি হাবিবুর রহমানের বই) ব্যবহার করা হয়েছে।

  • খ. উৎসের স্বচ্ছতা: দাবির উৎস হিসেবে একটি সুনির্দিষ্ট বই, প্রকাশের তারিখ এবং স্থান উল্লেখ করা হয়েছে যা পাঠকরা যাচাই করতে পারেন।

  • গ. পদ্ধতির প্রকাশ: ভাইরাল হওয়া “কোওট” বা উদ্ধৃতিটির সাথে প্রকৃত ঐতিহাসিক নথির তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

  • ঘ. নিরপেক্ষতা ও ন্যায্যতা: এই যাচাই প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে শুধুমাত্র দালিলিক প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শেখ হাসিনার পক্ষে বা বিপক্ষে কোনো অবস্থান নেওয়া হয়নি।

  • ঙ . উৎসের স্বচ্ছতা: দাবির সত্যতা যাচাইয়ে মূলধারার গণমাধ্যম, শেখ হাসিনার অফিশিয়াল ভাষণ এবং আর্কাইভ ব্যবহার করা হয়েছে।

  • চ. পদ্ধতির প্রকাশ: নির্দিষ্ট কি-ওয়ার্ড (যেমন: “Sheikh Hasina Hindus two boats quote”, “শেখ হাসিনা হিন্দুদের দুই নৌকায় পা”) ব্যবহার করে গুগল সার্চ এবং ভিডিও আর্কাইভ বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

সিদ্ধান্ত (Verdict)

🟡 বিভ্রান্তিকর (MISLEADING)

৬. ব্যাখ্যা দাবিটি বিভ্রান্তিকর কারণ শেখ হাসিনা হুবহু “হিন্দুদের দুই নৌকায় পা” কথাটি বলেননি। ১৯৯৯ সালে নিউ ইয়র্কে এক বক্তব্যে তিনি হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নেতাদের উদ্দেশ্য করে “এক পা ভারতে আর এক পা বাংলাদেশে” না রাখার পরামর্শ দিয়েছিলেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁর সেই বক্তব্যের শব্দ পরিবর্তন করে এবং প্রেক্ষাপট সরিয়ে ফেলে এটিকে একটি আক্রমণাত্মক প্রবাদ (“দুই নৌকায় পা”) হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে, যা মূল বক্তব্যের সঠিক প্রতিফলন নয়। এটি একটি প্যারাফ্রেজ বা ভাবার্থকে ভুলভাবে সরাসরি উদ্ধৃতি হিসেবে চালানোর উদাহরণ।

সংশোধন ও পরামর্শ

  • কোনো রাজনৈতিক নেতার বক্তব্য উদ্ধৃতি চিহ্নে (” “) দেখলে তা শেয়ার করার আগে নিশ্চিত হোন সেটি হুবহু তাঁর মুখের কথা, নাকি কারো করা ব্যাখ্যামূলক সারসংক্ষেপ।

  • ভবিষ্যতে এই দাবিটি খণ্ডন করার জন্য বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের বইয়ের ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৯৯-এর এন্ট্রিটি রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

Share on Social Media

Previous Post
Next Post

Related Posts

Find Us On Social Media

সর্বশেষ প্রকাশিত

Ownership & Funding:

An initiative of THE

BRICKLANE NEWS LIMITED

(Company No-10776054)

You have been successfully Subscribed! Ops! Something went wrong, please try again.

Related Links

Awards

Success Story

Address

Copyright © 2026 Fact Check Zone | An initiative of Bricklane News Ltd | All rights reserved.