আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনে জুলাই জাতীয় সনদের ওপর অনুষ্ঠিত হবে গণভোট যেখানে ব্যালটে থাকা প্রশ্নের জবাবে ভোটাররা ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ এর মধ্য দিয়ে নিজের মতামত প্রকাশ করবেন। এরই প্রেক্ষিতে সম্প্রতি অনলাইনে দাবি প্রচার করা হয়েছে, গণভোটে হ্যাঁ ভোট দেওয়া মানে সংবিধান থেকে ‘মহান আল্লাহ তায়ালার প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস’ এবং ‘বিসমিল্লাহ’ তুলে দেয়ার পক্ষে রায় দেওয়া।
এরূপ দাবিতে ফেসবুকে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ) এবং এখানে (আর্কাইভ)।
এছাড়া, জাতীয় দৈনিক প্রথম আলো সূত্রে জানা যায়, গত ১১ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় দলীয় এক আয়োজনে কৃষক দলের নেতা জুয়েল আরমান দাবি করেন, আগামী গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জিতলে সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহ’ ও ‘আল্লাহর নামে শুরু করিলাম’ বাক্যটি থাকবে না।
এছাড়াও, মুফতী এনায়েতুল্লাহ আব্বাসী এক মাহফিলে দাবি করেন, গণভোটে হ্যাঁ ভোট জয়ী হলে সংবিধান থেকে ‘মহান আল্লাহ তায়ালার প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস’ তুলে দেয়া হবে।
ফ্যাক্টচেক
টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, গণভোটে হ্যাঁ জিতলে সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহ’ ও ‘আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস’ থাকবে না শীর্ষক দাবি সঠিক নয়৷ প্রকৃতপক্ষে, সংবিধানের প্রস্তাবনার শুরু থেকে ‘বিসমিল্লাহ’ সরানোর কোনো প্রস্তাব জুলাই জাতীয় সনদে বা গণভোটে নেই। এছাড়া, জিয়াউর রহমানের সময়ে সংবিধানের মূলনীতিতে ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবর্তে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসকে’ রাষ্ট্রীয় ‘সকল কাজের ভিত্তি’ বলা হয়েছিল, যা বর্তমান সংবিধানে নেই। তাই, গণভোটে তা বাদ দেওয়ার বিষয়ও অযৌক্তিক। তবে সংবিধানের মূলনীতির পরিবর্তনের সুপারিশ জুলাই জাতীয় সনদে রয়েছে।
এ বিষয়ে অনুসন্ধানে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে থাকা বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধান পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, সংবিধানের প্রস্তাবনার শুরুতে ‘বিস্মিল্লাহির-রহ্মানির রহিম (দয়াময়, পরম দয়ালু, আল্লাহের নামে)/ পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তার নামে’ লেখা রয়েছে। তবে, সংবিধানের মূলনীতিতে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ এর উল্লেখ পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে অনুসন্ধানে বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, “১৯৭৯ সালে পঞ্চম সংশোধনীতে ১৯৭৭ সালের জিয়াউর রহমানের সামরিক আদেশকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যাতে সংবিধানের মূলনীতিতে ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবর্তে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসকে’ রাষ্ট্রীয় ‘সকল কাজের ভিত্তি’ বলা হয়েছিল। এছাড়া, সমাজতন্ত্রকে ব্যাখ্যা করা হয় ‘অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচার’ হিসেবে। পরবর্তীতে, ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আবার ধর্মনিরপেক্ষতাসহ মূলনীতিগুলো প্রতিস্থাপন করা হয়।’
পরবর্তীতে গণভোটের বিষয়ে অনুসন্ধানে প্রথম আলো সূত্রে জানা যায়, গণভোটে থাকা প্রশ্নটি হবে এ রকম ‘আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার–সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবগুলোর প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করছেন?’ এরপর ৪ টি ধাপে নানা সুপারিশের বিষয়ের উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে কোথাও আলোচিত দাবির উল্লেখ পাওয়া যায়নি।
তথ্যসূত্র
- Ministry of Law, Justice and Parliamentary Affairs – গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান
- BBC Bangla – ধর্মনিরপেক্ষতার বদলে বহুত্ববাদ, সংবিধানের মূলনীতিগুলো পরিবর্তনের প্রস্তাব কেন?
- Prothom Alo – যে চার বিষয়ে হবে গণভোট, একটি প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ দিয়ে মতামত
- Chief Adviser GOB – জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫
