নাইজেরিয়ার মেয়েরা কি খালেদা জিয়ার কারণে শিক্ষিত হচ্ছে? জাইমা রহমানের আলোচিত দাবির নেপথ্যে আসল তথ্য
১. দাবির সারাংশ
দাবি করা হচ্ছে যে, “নাইজেরিয়ার মেয়েরা খালেদা জিয়ার কারণে শিক্ষিত হচ্ছে”।
দাবি সারসংক্ষেপঃ
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেওয়া প্রাথমিক শিক্ষার পদক্ষেপগুলো (বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষা সংক্রান্ত) নাইজেরিয়া সরকার পর্যবেক্ষণ ও অনুসরণ করে সে দেশে বাস্তবায়ন করেছে, যার ফলে বর্তমানে নাইজেরিয়ার লাখ লাখ মেয়ে প্রাথমিক শিক্ষা পাচ্ছে।
দাবির উৎসঃ
উৎস: গত ১৮ জানুয়ারি ২০২৬-এ ঢাকা ফোরামের সভায় ব্যারিস্টার জাইমা রহমানের বক্তব্য এবং পূর্বে ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫ এ সেসময় লন্ডনে অবস্থানরত তারেক রহমানের একটি ভার্চুয়াল বক্তব্য।
প্রেক্ষাপট: লন্ডনের একটি হাসপাতালে কর্মরত একজন নাইজেরিয়ান নার্সের সাথে কথোপকথনের ভিত্তিতে এই দাবি করা হয়েছে। এটি একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বর্ণনা বা ‘অ্যানেকডোটাল এভিডেন্স’ (Anecdotal Evidence)।
সামাজিক মাধ্যমে দাবি পরবর্তী প্রেক্ষাপটঃ জাইমা রহমানের বাবা তারেক রহমানের দাবির পুনরাবৃত্তি করে ঢাকা ফোরাম আয়োজিত জাতি গঠনে নারী : নীতি, সম্ভাবনা ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শীর্ষক আলোচনা সভায় জাইমা রহমান বলেন, প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসনের উদ্যোগের কারণেই আজ আফ্রিকা মহাদেশের লাখ লাখ মেয়ে এখন অন্তত প্রাথমিক শিক্ষা পাচ্ছে।
ব্যারিস্টার জাইমা রহমান জানান, গত বছরের শুরুর দিকে তার দাদি বেগম খালেদা জিয়া চিকিৎসার জন্য পরিবারের সঙ্গে লন্ডনে অবস্থানকালে একটি হাসপাতালের অভিজ্ঞতা তাকে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। সেখানে বিভিন্ন দেশের চিকিৎসক ও নার্স কর্মরত ছিলেন। তাদের মধ্যে নাইজেরিয়ার একজন নার্সও ছিলেন।
তিনি বলেন, “একদিন সকালে আব্বু-আম্মু হাসপাতালে দাদুকে দেখতে গেলে সেই নার্স বলেন- আমি তো আপনার মাকে চিনেছি। তখন আব্বু-আম্মু জানতে চান, কীভাবে? ওই নার্স তখন জিজ্ঞেস করেন, আপনার মা কি বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী নন?”
তারেক কন্যা জাইমা রহমান আরও দাবি করেন, বিষয়টি শুনে তার বাবা-মা (তারেক রহমান ও ডা. জুবাইদা রহমান) বিস্মিত হলে ওই নার্স ব্যাখ্যা করেন, বেগম খালেদা জিয়া মেয়েদের জন্য, বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষায় যে উদ্যোগগুলো নিয়েছিলেন, সেগুলো প্রায় ৩০-৩৫ বছর আগে নাইজেরিয়া সরকার পর্যবেক্ষণ করে বাস্তবায়ন করে।
এসময় তিনি আরও দাবি করেন , “ওই কারণেই আজ নাইজেরিয়ার গ্রামাঞ্চলে লাখ লাখ মেয়ে এখনও অন্তত প্রাথমিক শিক্ষা পাচ্ছে।”
এদিকে এই দাবির পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে এই ঘটনায় পক্ষে-বিপক্ষে চলছে তীব্র আলোচনা ও সমালোচনা । বিষয়বস্তুর গুরুত্ব বিবেচনায় ফ্যাক্ট চেক জোনের আজকের অনুসন্ধান, “প্রাথমিক শিক্ষায় বেগম খালেদা জিয়ার নেওয়া পদক্ষেপ কী সত্যিই নাইজেরিয়ায় অনুসরণ করা হয়েছিলো ? “
জাগো নিউজে প্রকাশিত খবরের লিংক এখানে –
সময় সংবাদে প্রকাশিত খবরের লিংক এখানে
ফেসবুকে প্রকাশিত পোস্ট এখানে
ইউটিউবে প্রকাশিত বক্তব্যের ভিডিও এখানে,
এমন দাবিতে তারেক রহমানের বক্তব্য [লন্ডনে নাইজেরিয়ান এক নার্সের যে কথায় অবাক হন তারেক রহমান] বক্তব্য এখানে
তথ্য-যাচাইয়ের অনুসন্ধানঃ
অনুসন্ধানে দেখা গেছে যে, নাইজেরিয়ার প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার প্রধান সংস্কারগুলো বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলের (১৯৯১-১৯৯৬) অনেক আগেই শুরু হয়েছিল অথবা ভিন্ন প্রেক্ষাপটে তৈরি হয়েছে:
১. সময়ের ব্যবধান: নাইজেরিয়ায় আধুনিক প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়েছিল ১৮৪২ সালে এবং তাদের প্রথম বড় জাতীয় কর্মসূচি ‘ইউনিভার্সাল প্রাইমারি এডুকেশন’ (UPE) চালু হয়েছিল ১৯৭৬ সালে। বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ১৯৭১ সালে এবং ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৩৬,১৬৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করেন। নাইজেরিয়ার ১৯৭৬ সালের পদক্ষেপটি ছিল তাদের অভ্যন্তরীণ দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার ফসল, যা বাংলাদেশের সমসাময়িক হলেও সরাসরি অনুকরণ ছিল না।
২. ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রভাব: নাইজেরিয়া এবং বাংলাদেশ, উভয় দেশই ব্রিটিশ শাসনের অধীনে ছিল। ফলে দুই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মূলে রয়েছে ব্রিটিশ মডেল। নাইজেরিয়া মূলত ব্রিটিশ কারিকুলাম এবং প্রশাসনিক কাঠামো অনুসরণ করেছে, যা তারা তাদের নিজস্ব প্রয়োজন অনুযায়ী পরিমার্জন করেছে।
৩. আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রভাব: ১৯৭০-এর দশকে অনেক উন্নয়নশীল দেশ (যেমন- নাইজেরিয়া, কেনিয়া, পাকিস্তান) ইউনেস্কো এবং জাতিসংঘের বৈশ্বিক সাক্ষরতা লক্ষ্যমাত্রাকে সামনে রেখে প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করার চেষ্টা করছিল। নাইজেরিয়ার তৎকালীন সামরিক সরকার (জেনারেল ওলুসেগুন ওবাসাঞ্জোর সময়) মূলত এই আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট এবং নিজেদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির (তেল সম্পদের কারণে) উপর ভিত্তি করে এই পদক্ষেপ নিয়েছিল।
কমিউনিটি লার্নিং: বাংলাদেশের ‘ব্র্যাক’ (BRAC)-এর মতো এনজিওগুলোর শিক্ষা মডেল বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। নাইজেরিয়ার কিছু অংশে স্থানীয় পর্যায় বা এনজিও ভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের এই সফল মডেলগুলো পরবর্তী সময়ে (৯০-এর দশক বা তার পরে) গবেষণার বিষয়বস্তু হয়েছে।
সারসংক্ষেপ: নাইজেরিয়া তাদের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রাথমিক ভিত্তি গড়েছিল ব্রিটিশদের অনুসরণ করে এবং পরবর্তীতে তারা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করেছে। বাংলাদেশের কোনো নির্দিষ্ট মডেল বা সরকার প্রধানকে অনুসরণ করে তারা শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করেছে, এমন দাবিটি ঐতিহাসিকভাবে সঠিক নয়। তবে বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে শিক্ষা এবং প্রযুক্তি বিনিময়ের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে,
নাইজেরিয়ার ইউনিভার্সাল প্রাইমারি এডুকেশন (UPE): নাইজেরিয়াতে আধুনিক প্রাথমিক শিক্ষা কর্মসূচি অনেক পুরোনো। দেশটিতে ১৯৭৬ সালেই জাতীয়ভাবে ‘ইউনিভার্সাল প্রাইমারি এডুকেশন’ (UPE) কর্মসূচি চালু করা হয়, যা বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক ছিল। এটি বেগম খালেদা জিয়ার ক্ষমতায় আসার ১৫ বছর আগের ঘটনা।
সূত্র: UNESCO Digital Library – Education in Nigeria
ইউনিভার্সাল বেসিক এডুকেশন (UBE) ১৯৯৯: নাইজেরিয়া ১৯৯৯ সালে তাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার আনে এবং ‘Universal Basic Education’ (UBE) কমিশন গঠন করে। এটি ছিল তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের (সামরিক শাসন থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণ) অংশ।
সূত্র: Universal Basic Education Commission (UBEC) Nigeria
বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা সংস্কার: বাংলাদেশে ১৯৯০ সালে ‘প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক আইন’ পাস হয় এবং ১৯৯২ সালে সারা দেশে তা কার্যকর করা হয়। খালেদা জিয়ার সরকারের অধীনে ১৯৯৩ সালে ‘শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য’ (Food for Education) কর্মসূচি চালু হয় ।
দাপ্তরিক প্রমাণের অভাব: নাইজেরিয়া সরকার বা আন্তর্জাতিক সংস্থা (যেমন- UNESCO, World Bank, UNICEF)-এর কোনো নথিপত্রে এমন কোনো উল্লেখ নেই যে, নাইজেরিয়া তাদের শিক্ষা নীতি তৈরির ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্টভাবে বেগম খালেদা জিয়ার পদক্ষেপ বা বাংলাদেশের মডেল ‘অনুসরণ’ করেছিল।
IFCN নীতিমালা অনুযায়ী মূল্যায়ন
ক. নিরপেক্ষতা ও ন্যায্যতা : আমরা এই দাবিটি রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নির্বিশেষে যাচাই করেছি। ঐতিহাসিক টাইমলাইন এবং সরকারি নথির ভিত্তিতে নিরপেক্ষভাবে তথ্যের সত্যতা যাচাই করা হয়েছে।
খ. উৎসের স্বচ্ছতা : নাইজেরিয়ার সরকারি শিক্ষা পোর্টাল এবং ইউনেস্কোর ঐতিহাসিক তথ্যাবলি ব্যবহার করা হয়েছে। দাবির স্বপক্ষে কোনো দাপ্তরিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
গ. পদ্ধতিগত স্বচ্ছতা: নাইজেরিয়ার শিক্ষা ব্যবস্থার ইতিহাস (১৮৪২ থেকে বর্তমান), প্রধান সংস্কারের সাল (১৯৭৬, ১৯৯৯) এবং বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলনা করা হয়েছে।
রায় (Verdict)
❌ FALSE (মিথ্যা)
ব্যাখ্যাঃ
নাইজেরিয়ার জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা কর্মসূচি (UPE) ১৯৭৬ সালে শুরু হয়েছিল, যা বেগম খালেদা জিয়ার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার অনেক আগের ঘটনা। যদিও নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের নারী শিক্ষার অগ্রগতি বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছিল, তবে নাইজেরিয়া সরকার খালেদা জিয়ার পদক্ষেপ অনুসরণ করে তাদের শিক্ষা ব্যবস্থা সাজিয়েছে—এমন কোনো দাপ্তরিক প্রমাণ বা ঐতিহাসিক তথ্য নেই। দাবিটি মূলত একজন ব্যক্তির (নার্স) ব্যক্তিগত মন্তব্যের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে, যার কোনো দাপ্তরিক ভিত্তি নেই।
সংশোধন / সুপারিশঃ
ভবিষ্যতে এ ধরনের আন্তর্জাতিক নীতি সংক্রান্ত দাবি যাচাইয়ের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারি গেজেট বা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর (যেমন- বিশ্বব্যাংক বা ইউনেস্কো) সংক্রান্ত প্রতিবেদনগুলো যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
তথ্যসূত্রসমূহ:
History of Education in Nigeria – Britannica
Universal Basic Education Commission, Nigeria – Official Website
Compulsory Primary Education Act 1990, Bangladesh
The 1976 Universal Primary Education (UPE) in Nigeria – Academic Research




