আওয়ামী লীগের ভোটার নিয়ে বিভ্রান্তিকর জরিপের ফাঁদে গণমাধ্যম

ফ্যাক্ট চেক জোন টিম
যাচাইঅযোগ্য (UNVERIFIABLE) 🟡

১. দাবির সারাংশ

দুটি ভুঁইফোড় সংস্থার জরিপের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমগুলো প্রকাশ করেছে “আওয়ামী লীগের ভোটারদের একটি বড় অংশ (৪৮.২%) এবার বিএনপিকে “ এবং ২৯.৯% জামায়াতকে ভোট দিতে চান।

২. ফ্যাক্ট-চেক বিশ্লেষণ

আমাদের দীর্ঘ অনুসন্ধানে এই জরিপটির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বেশ কিছু গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে:

দাবির সারসংক্ষেপঃ 
সম্প্রতি ‘কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন’ (CRF) এবং ‘বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক অপিনিয়ন স্টাডিজ’ (BEPOS) নামক দুটি সংস্থা “Uncovering the Public Pulse: A Nationwide Survey” শীর্ষক একটি জরিপ প্রকাশ করেছে। এতে দাবি করা হয়েছে, আওয়ামী লীগের ভোটারদের একটি বড় অংশ (৪৮.২%) এখন বিএনপিকে এবং ২৯.৯% জামায়াতকে ভোট দিতে চান। ১১,০৩৮ জন ভোটারের মতামতের ভিত্তিতে এই ফলাফল পাওয়া গেছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
দাবির উৎস ও প্রেক্ষাপটঃ 
মূলধারার গণমাধ্যম (প্রথম আলো, বাংলা নিউজ২৪দৈনিক যুগান্তর , কালের কন্ঠ  , যমুনা টিভি ইত্যাদি) এবং ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকায় গুরুত্বের সাথে প্রকাশিত হয়েছে।
ফেসবুকে প্রকাশিত দ্যা পোস্টের স্ক্রিনশট

প্রেক্ষাপট: ৫ই আগস্টের পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জনমত কোন দিকে যাচ্ছে, তা নিয়ে জনমনে প্রবল কৌতূহল রয়েছে। এই সুযোগে অখ্যাত দুটি সংস্থা জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে এই তথ্যগুলো প্রকাশ করে।

ফ্যাক্ট-চেকিং অনুসন্ধানঃ
আমাদের দীর্ঘ অনুসন্ধানে এই জরিপটির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বেশ কিছু গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে:

ক. মেথডোলজি ও অর্থায়নের অস্বচ্ছতা: জাতীয় পর্যায়ের একটি জরিপ পরিচালনা করতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ও প্রশিক্ষিত জনবলের প্রয়োজন হয়। ফ্যাক্ট চেক জোনের পক্ষ থেকে গত ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ তারিখে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে ইমেইল পাঠিয়ে জরিপের পূর্ণাঙ্গ মেথডোলজি, স্যাম্পলিং ফ্রেম এবং অর্থায়নের উৎস জানতে চাওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত সংস্থাগুলো অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির নাম প্রকাশ করতে পারেনি। মেথডোলজি বা অর্থায়ন গোপন রাখা আন্তর্জাতিক গবেষণা নীতিমালার পরিপন্থী।

খ. সংস্থাগুলোর রহস্যময় পরিচয় ও ‘ভুঁইফোড়’ হওয়ার আশঙ্কা: CRF: এদের ওয়েবসাইট (crfoundationbd.org) পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এটি অত্যন্ত নতুন এবং এর আগে তাদের বড় কোনো গবেষণার রেকর্ড নেই।
BEPOS: এই নামে কোনো স্বতন্ত্র ওয়েবসাইট বা নিবন্ধিত কোনো গবেষণা সংস্থার অস্তিত্ব অনলাইনে খুঁজে পাওয়া যায়নি। এটি শুধুমাত্র এই জরিপের জন্যই ব্যবহৃত একটি ‘শেল অর্গানাইজেশন’ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

গ. বিতর্কিত ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতা: সিআরএফ (CRF)-এর বোর্ড অফ ডিরেক্টরস তালিকায় ইলিয়াস হোসেন নামক একজন বিতর্কিত ব্যক্তিত্বের নাম পাওয়া গেছে। তিনি ইউটিউবে উসকানিমূলক ও অপ্রমাণিত তথ্য ছড়ানোর জন্য সমালোচিত এবং অতি সম্প্রতি তার ফেসবুক পেজটি সহিংসতা উসকে দেওয়ার অভিযোগে মেটা (Meta) কর্তৃক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। একজন প্রকাশ্য রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যক্তির গবেষণা সংস্থার বোর্ডে থাকা জরিপের নিরপেক্ষতাকে সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করে।

ঘ. অপ্রাসঙ্গিক বিশেষজ্ঞের উপস্থিতি: জরিপটিতে বিশেষজ্ঞ হিসেবে নাম ব্যবহার করা হয়েছে অধ্যাপক আক্কাস আলীর। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তিনি মূলত জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বা কৃষি বিজ্ঞানের (বিএআরআই) গবেষক। একটি জাতীয় রাজনৈতিক জরিপে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বা পরিসংখ্যানের বিশেষজ্ঞের পরিবর্তে কৃষি বিজ্ঞানীর যুক্ত থাকা গবেষণার সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করে।

ঙ. মূলধারার গণমাধ্যমের নৈতিক দায়বদ্ধতা: প্রথম আলো, ডেইলি স্টার এবং অন্যান্য গণমাধ্যম এই জরিপটি প্রকাশের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার ক্রস-চেক বা গেটকিপিং করেনি। সাংবাদিকতার মৌলিক নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো নতুন সংস্থার বড় দাবি প্রকাশের আগে তাদের সক্ষমতা ও নিরপেক্ষতা যাচাই করা উচিত ছিল, যা এখানে অনুপস্থিত।

 IFCN নীতিমালা অনুযায়ী মূল্যায়নঃ
ক. নিরপেক্ষতা ও ন্যায্যতা: আমরা জরিপের রাজনৈতিক ফলাফলের চেয়ে এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ও স্বচ্ছতা যাচাই করেছি।
খ. উৎসের স্বচ্ছতা: জরিপকারী সংস্থাগুলোর অস্বচ্ছ পরিচয় এবং বিতর্কিত বোর্ড মেম্বারের তথ্য জনসম্মুখে আনা হয়েছে।
গ. কর্মপদ্ধতি প্রকাশ: সংস্থাগুলো তাদের ডাটা কালেকশন মেথড বা ফান্ডের উৎস প্রকাশ করতে ব্যর্থ হয়েছে।

 সিদ্ধান্ত (Verdict)

⚠️ বিভ্রান্তিকর ও যাচাইঅযোগ্য (MISLEADING / UNVERIFIABLE)

ব্যাখ্যা :
জরিপ পরিচালনাকারী সংস্থাগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং তাদের অর্থায়নের উৎস রহস্যময়। বোর্ড অফ ডিরেক্টরসে একজন বিতর্কিত ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি এবং রাজনৈতিক জরিপে অপ্রাসঙ্গিক বিশেষজ্ঞের ব্যবহার এই গবেষণার নিরপেক্ষতাকে নষ্ট করেছে। মূলধারার গণমাধ্যমগুলো যথাযথ মেথডোলজিক্যাল প্রশ্ন ছাড়াই এটি প্রচার করায় সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে।

সংশোধন ও সুপারিশ: 
জনসাধারণকে অনুরোধ করা হচ্ছে, যেকোনো চাঞ্চল্যকর জরিপের ফলাফল বিশ্বাস করার আগে জরিপকারী সংস্থার পূর্ব ইতিহাস এবং তাদের অর্থায়নের উৎস সম্পর্কে সচেতন থাকুন। মূলধারার গণমাধ্যমগুলোর উচিত এ ধরণের সংবেদনশীল সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে আরও বেশি সতর্ক হওয়া।

📌 তথ্যসূত্র ও প্রামাণ্য দলিল (Sources & Evidences)

* এই তথ্যগুলো ফ্যাক্ট-চেক জোনের নিজস্ব অনুসন্ধান এবং পাবলিক ডোমেইন থেকে সংগৃহীত।

Share on Social Media

Previous Post
Next Post

Related Posts

Find Us On Social Media

সর্বশেষ প্রকাশিত

Ownership & Funding:

An initiative of THE

BRICKLANE NEWS LIMITED

(Company No-10776054)

You have been successfully Subscribed! Ops! Something went wrong, please try again.

Related Links

Awards

Success Story

Address

Copyright © 2026 Fact Check Zone | An initiative of Bricklane News Ltd | All rights reserved.